জীবন ধারণের জন্য জীবিকা অপরিহার্য। এই জীবিকার খোঁজেই মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চল, গ্রাম থেকে শহর, এমনকি দেশ ছেড়ে বিদেশেও পাড়ি জমায়। নতুন জীবনের সন্ধানে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ ঢাকায় আসেন। তবে সম্প্রতি এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। ফলে রাজধানীর জনঘনত্ব বাড়ছে এবং স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ নাগরিক সেবার ওপর বাড়ছে চাপ। এতে ঢাকাকে ‘মৃতপ্রায়’ বা ‘ডেড সিটি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
ঢাকামুখী জনস্রোতের কারণ
সূত্র জানায়, কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে ঢাকায় আসছেন। বোরো মৌসুম শেষে দিনমজুরদের বেকারত্ব এবং গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাবই এই ঢাকামুখী জনস্রোতের প্রধান কারণ। এর ফলে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিণত হচ্ছে, বাড়ছে বস্তির সংখ্যাও।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দৃশ্য
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে উপশহরের প্রধান সড়কের পাশে কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই চোখে পড়ে—স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে কেউ না কেউ ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। হাতে থাকা একটি কাগজ দেখিয়ে তারা ঠিকানা জানতে চান, কিংবা এলাকায় পৌঁছে নির্দিষ্ট কারও বাড়ির খোঁজ করেন। এমন কাউকে দেখলেই বোঝা যায়, তিনি ঢাকার নতুন ‘মেহমান’। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। রাজধানীর মাদারটেক, নন্দীপাড়া, যাত্রাবাড়ী, সানারপাড়, বছিলা ও মেরাদিয়া এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
একটি পরিবারের গল্প
মাতুয়াইলের মুসলিমনগর এলাকায় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেখা যায়, মধ্যবয়স্ক এক দম্পতি টিনশেড ঘর ভাড়া পাওয়া যাবে কি না জানতে চাইছেন। তারা জানান, শরীয়তপুরের ঘোষের হাট তাদের গ্রামের বাড়ি। দুই সন্তানকে নিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছেন। দুদিন ধরে এক আত্মীয়ের বাসায় আছেন, তবে সেখানে দীর্ঘদিন থাকা সম্ভব নয়। তাই ভাড়া বাসা খুঁজছেন। বাসা পেলেই কোনওভাবে সংসার গুছিয়ে কাজের সন্ধানে নামবেন। শুধু মাতুয়াইল নয়, রাজধানীর নিম্নাঞ্চলজুড়ে এমন দৃশ্য এখন নিয়মিত।
অভিবাসনের পরিসংখ্যান
জানা গেছে, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ মানুষ ঢাকায় আসে। তবে গত কয়েক মাসে আসা অধিকাংশই জীবিকার তাগিদে পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে রাজধানীতে এসেছেন। তাদের মধ্যে উত্তরবঙ্গ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে আসার হার বেশি।
গ্রামের তুলনায় ঢাকায় কাজের সুযোগ
গ্রামের তুলনায় ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক খাতে—যেমন রিকশা চালানো, দিনমজুরি বা গৃহকর্মে—কাজের সুযোগ তুলনামূলক বেশি। অতীতে বন্যা, নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ গ্রাম ছাড়লেও এখন মূলত অভাবই তাদের শহরমুখী করছে। গ্রামে আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় তারা বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসছেন। করোনাকালে অনেকে কাজ হারিয়ে বা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী ছেড়েছিলেন, এখন আবার জীবিকার খোঁজে ফিরছেন।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সদ্য সমাপ্ত মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের দামও বেড়েছে। সবজি, মুরগি ও ডিমসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পণ্যমূল্য ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অভিবাসীদের বক্তব্য
জয়পুরহাট থেকে বছিলায় আসা মকবুল হোসেন বলেন, স্থানীয় বাজারে ছোট মুদি দোকান চালিয়ে এতদিন চারজনের সংসার চললেও এখন আর চলছে না। ক্রেতা কমে গেছে, যারা আসে তারাও কম কিনছে। ফলে দোকানের মালামাল বিক্রি করে ঢাকায় চলে এসেছেন। তিনি জানান, আপাতত অটোরিকশা চালাবেন, পরে ছোট ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা আছে।
বরগুনা থেকে মাতুয়াইলে আসা সোহরাব হোসেন বলেন, গ্রামে অটো চালিয়ে আগে কোনওভাবে সংসার চললেও এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রী কমে গেছে, অটোর সংখ্যা বেড়েছে। ফলে আয় কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাকায় এসেছেন। এখানেও অটো চালানোর পরিকল্পনা তার।
বিশেষজ্ঞের মতামত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রওনক জাহান তালুকদার বলেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিম্নআয়ের মানুষের সংকট বাড়ে। তখন তারা পেশা পরিবর্তন করে বা বাসস্থান বদলায়। সাম্প্রতিক সময়ে এমন পরিস্থিতির কারণে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছেন।
সরকারের পদক্ষেপ
এ বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ফ্যামেলি কার্ডসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের মধ্যে আরও সুযোগ সৃষ্টি হবে, ফলে জীবিকার জন্য মানুষকে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হবে না।



