জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেলচালকের টিকে থাকার লড়াই
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেলচালকের টিকে থাকার লড়াই

১৬ বছর ধরে ভাড়ায় মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে সংসার চালান আতিয়ার রহমান। শুক্রবার দুপুরে খুলনার গল্লামারী বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেলে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। অন্য হাতে তালপাতার পাখায় একটু স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা। ঘাম ঝরছে থেমে থেমে, রোদের তাপে ফুটছে চারপাশ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যাত্রী নিয়ে এখানে এসেছেন। বেলা দেড়টা বাজলেও নতুন কোনো যাত্রীর দেখা নেই। চোখেমুখে অপেক্ষার ক্লান্তি আর কণ্ঠে অনিশ্চয়তা নিয়ে বললেন, ‘কখন যাত্রী পাব ঠিক নেই। এখন সবই কপালের ওপর।’

জীবনের পথচলা

খুলনার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের গড়খালী গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার রহমান। তাঁর বয়স ৫০ বছর। এই জীবনের ১৬ বছর ধরে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়েই সংসার চলছে। খুলনা নগরের প্রবেশদ্বার গল্লামারী থেকে দাকোপ–পাইকগাছা সীমান্তের মোজামনগর পর্যন্ত তাঁর নিয়মিত রুট। উপজেলার অভ্যন্তরীণ পথেও যাত্রী নিয়ে যান। উপকূলের এই অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ অনুন্নত হওয়ায় মোটরসাইকেলই অন্যতম ভরসার যান। হাজারো মানুষ এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক জ্বালানিসংকট তাঁদের জীবনযাত্রাকে ওলটপালট করে দিয়েছে।

জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার

কিছুদিন আগেও গ্রামের দোকানেই জ্বালানি তেল পেতেন। সেই দিন এখন নেই। এখন শহরের পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। শুক্রবার দুপুরে গল্লামারী বাসস্ট্যান্ডে আতিয়ার রহমান বলছিলেন, ‘কখনো তিন ঘণ্টা, কখনো পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়েছি। তারপরও নিশ্চয়তা নেই তেল পাব কি না। কখনো ৩০০, কখনো ৫০০ টাকার তেল নিয়ে ফিরে এসেছি। এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরেছি শুধু তেলের আশায়। গত দুই-তিন দিনে লাইন কিছুটা কমলেও সমস্যা কাটেনি পুরোপুরি। চাহিদামতো পেট্রল না পেয়ে অনেক সময় অকটেন নিতে হচ্ছে। অকটেনে মাইলেজ কম। খরচ বাড়ে। কিন্তু যাত্রী তো সেটা বুঝতে চায় না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আয়ে সরাসরি আঘাত

জ্বালানির এই সংকট সরাসরি আঘাত করেছে আয়ে। আগে খরচ বাদে দিনে ৬০০–৭০০ টাকা থাকত, এখন তা নেমে এসেছে ৩০০–৪০০ টাকায়। তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বাড়াতে হয়েছে, কিন্তু যাত্রী কমে গেছে। অটোরিকশায় ভাড়া না বাড়ায় অনেক যাত্রী সেদিকে ঝুঁকছেন। তার ওপর প্রচণ্ড রোদে যাত্রী চলাচলও কমে গেছে, স্ট্যান্ড আরও ফাঁকা হয়ে পড়ছে।

স্ট্যান্ডে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎই কথায় বেরিয়ে আসে তাঁর দুশ্চিন্তা। বলেন, ‘আগে দুপুরে হোটেলে খেয়ে নিতাম। এখন অনেক সময় দুপুরে না খেয়েই থাকি। শুকনো কিছু খেয়ে কাজ চালাই, যদি একটু টাকা বাঁচে।’

সংসারের চাপ

দুই ছেলে, স্ত্রী ও বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার তাঁর। বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। আয় কমে যাওয়ায় টান পড়েছে সংসারে। প্রায় দুই লাখ টাকার ঋণ মাথায় নিয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন জানিয়ে আতিয়ার বলেন, ‘গ্রামে থাকলেও পানিটাও আমাদের কিনে খেতে হয়। সব মিলিয়ে ধার করতে হচ্ছে। গাড়ি চালিয়ে শোধ দিই, কিন্তু সংসার আর ঋণ—দুটোই সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। এভাবে কত দিন? এভাবে কি জীবন চলে? এখন তো মনে হয় কোনোমতে টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় কাজ।’

লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা

জ্বালানিসংকট, বাড়তি খরচ, কমে যাওয়া আয়—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। সব মিলিয়ে আতিয়ার রহমানদের জীবন এখন টিকে থাকার লড়াই। আতিয়ার রহমান বললেন, ‘কষ্ট করে নাহয় জীবন চলে। কিন্তু বাচ্চাদের কষ্টটা দেখতে পারি না। গরমের কারণে ঘুম আসে না—ঘামে ভেজা শরীরে হাতপাখাই ভরসা। রাতে দুই ঘণ্টার বেশি ঘুম হয় না বললেই চলে। বিদ্যুৎ মেহমানের মতো আসে মাঝে মাঝে। সারারাতে মিলিয়ে ঘণ্টাখানেক থাকে। আগে রাইস কুকারে রান্না হতো, এখন বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেটাও সম্ভব হয় না। গ্যাসের দামও মারাত্মক হারে বেড়েছে, খরচের চাপ কীভাবে সামলাব?’

সৌরবিদ্যুৎ নেই

একসময় তাঁর বাড়িতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেটাও এখন বন্ধ। নতুন ব্যাটারি কিনতে ছয়–সাত হাজার টাকা দরকার—এ অবস্থায় যা জোগাড় করা কঠিন। আতিয়ারের ভাষ্য, ‘এত টাকা একসঙ্গে কাছে থাকা তো লাগবে। কিস্তি দেব, না ব্যাটারি কিনব—এই হিসাবই মেলাতে পারি না। গরমের কষ্ট তো ভোগ করাই লাগবে।’

যাত্রী পেয়ে আবার ছুটছেন

কথা বলতে বলতে বেলা আড়াইটার দিকে অবশেষে দুজন যাত্রী পান আতিয়ার রহমান। যাত্রীরা আগের ভাড়ায় যেতে চান। কিছুটা বাড়তি ভাড়ায় রাজি করিয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিতে দিতে আতিয়ার বললেন, ‘জীবনটাই তো লসের ওপর চলছে। আর কতক্ষণ বসে থাকব?’

গরমে ঝিমিয়ে পড়া দুপুরে আবার যাত্রী পেয়ে ছুটলেন আতিয়ার রহমান। গল্লামারী স্ট্যান্ডে তখনো ১৫–২০ জন মোটরসাইকেলচালক যাত্রীর অপেক্ষায়। তাঁদের একজন আবদুল কাবের গাইন বললেন, ‘এখন দিনে ৩০০ টাকা পকেটে নিয়ে ঘরে ফেরাটা কঠিন। আমাদের অবস্থা বর্তমানে খুবই ক্রাইসিস।’