অন্তঃসত্ত্বা সুমির টিসিবির পণ্য কিনতে সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা
অন্তঃসত্ত্বা সুমির টিসিবির পণ্য কিনতে সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা

আসাদগেটে টিসিবির লাইনে অপেক্ষায় সুমি আক্তার। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা তিনি। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চড়া রোদ ও ভ্যাপসা গরমে রীতিমতো ঘামছেন সুমি। একটু পরপর মুখের ঘাম মুছে নিচ্ছেন। এ অবস্থায় সুমি দাঁড়িয়েছেন টিসিবির সারিতে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে।

রাজধানীর আসাদগেটে সেন্ট যোসেফ স্কুলের সামনে আজ বৃহস্পতিবার দেখা হলো ২৬ বছর বয়সী সুমির সঙ্গে। এসেছেন রায়েরবাজার বারইখালী থেকে। সেখানে তিনি স্বামী ও সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। তাঁর এক ছেলে, বয়স চার বছর। দ্বিতীয়বারের মতো মা হতে চলেছেন।

তিনি বলেন, সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হয়েছেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এখনো পণ্য কিনতে পারেননি। সুমি বলেন, শুরুতে ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাব মাঠের কাছে যান। তখন সকাল সাড়ে ৯টা। সেখানে লম্বা সারি ছিল। ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করেন, কিন্তু গাড়ির দেখা পাননি। পরে জানতে পারেন, টিসিবির ট্রাক সেল হবে লালমাটিয়ায়। বেলা ১১টার দিকে সেখানে চলে আসেন। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেন। সেখানেও ট্রাক আসেনি। সেখান থেকে হেঁটে চলে আসেন আসাদগেটে। তখন দুপুর ১২টা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এবার কপাল ভালো, পণ্য নিয়ে গাড়ি এসেছে। তবে লম্বা সারি। আধা ঘণ্টা সারিতে দাঁড়ানোর পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি ৪৮০ টাকায় দুই কেজি ডাল, দুই লিটার ভোজ্যতেল ও এক কেজি চিনি কেনেন।

অন্তঃসত্ত্বা সুমিকে আগে পণ্য দিয়েছেন বলে জানান টিসিবির ডিলার ও সাজেদা জেনারেল স্টোরের মালিক আবদুর রউফ। এরও আধা ঘণ্টা পর বেলা একটার দিকে অন্যরা পণ্য পেতে শুরু করেন। ট্রাকের সামনে তখনো ৬৫ পুরুষ ও ৯০ নারী অপেক্ষায় ছিলেন।

সুমি বলেন, বাসা থেকে বেরোনোর সাড়ে তিন ঘণ্টা পর অবশেষে পণ্য পেলেন। কয়েক দিন পরপর এভাবে তাঁকে পণ্য কিনতে হয়। আজ যেটা কিনেছেন, তা দিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন চলে যাবে।

আক্ষেপ করে সুমি বলেন, ‘আজ তা–ও আগে পাইছি। কোনো সময় বিকেল চারটা–পাঁচটাও বাজে। আমগো ত আর টিসিবির কার্ড নাই। যাগোর কার্ড আছে, তাগোর ভিড়ে যাওয়া লাগে না। কষ্ট কম অয়।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কথায় কথায় সুমি বলেন, তাঁর স্বামী মো. রাসেল একটি কাপড়ের কারখানায় কাজ করেন। সংসারে খরচ বাড়ছে। প্রতি মাসে সংসার চালাতে টানাটানির মধ্যে পড়তে হয়। প্রতিদিনের বাজার সুমিকেই করতে হয়। কিন্তু এত কম টাকায় তিনি খরচ সামলাতে পারেন না।

অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর টিসিবির পণ্য কিনতে স্বামীকে আসতে বলেন বলে জানান সুমি। কিন্তু তাঁর স্বামী আসতে চান না। সুমি বলেন, ‘হের লজ্জা লাগে। কিন্তু সংসার তো আমার চালাইতে অয়। তাই একটু কম দামে কিনতে এত দূর আসছি। দোকানে গেলে দাম বেশি।’

লালমাটিয়ায় ট্রাকে পণ্য বিক্রি করার কথা টিসিবির ডিলার সাজেদা জেনারেল স্টোরের। কিন্তু সেখানে না গিয়ে সেন্ট যোসেফ স্কুলের সামনে কেন পণ্য বিক্রি করছেন, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আবদুর রউফ বলেন, রাস্তায় গাড়ির জট লাগে। তাই পুলিশ দাঁড়াতে দেয় না।

দেরি হওয়ার কারণ জানিয়ে আবদুর রউফ বলেন, ‘আমরা তো আগে পাইলে আগে বিক্রি শুরু করতে পারি। কিন্তু মাল লোড করতেই সময় গেছে গা। তাই দেরি। আমার সিরিয়াল ছিল ৪৩ নম্বর। সবার শেষের দিকে।’

শুরুতে সেন্ট যোসেফ স্কুলের সামনে পণ্য বিক্রি শুরু করলেও পরে ট্রাফিক পুলিশ সেখানে ট্রাকটিকে দাঁড়াতে দেয়নি। শেষে আবদুর রউফ তাঁর ট্রাক গলির ভেতরের একটি সড়কে নিয়ে পণ্য বিক্রি করেন।

পণ্য কিনতে মারামারি

বেলা ১১টায় মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের পাশে আসাদ অ্যাভিনিউয়ে ট্রাক সেল শুরু করে মেসার্স ফরহাদ স্টোর। টাউন হল বাজারের আশপাশে তার আগে থেকেই কয়েক শ মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন।

সকাল সাড়ে ১০টায় মেসার্স ফরহাদ স্টোর যখন টাউন হল বাজারে যায়, তখন মানুষেরা হুড়োহুড়ি করে সারিতে দাঁড়ান। কেউ কেউ দৌড়ে এসেও সারিতে দাঁড়ান। এর মধ্যে সারিতে দাঁড়ানো নিয়ে দুই নারীর কথা–কাটাকাটি হয়।

ওই দুই নারীর একজন ৫৫ বছর বয়সী আলেয়া বেগম। কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে আলেয়া বেগম পণ্য কিনতে আসা ৩৭ বছর বয়সী আরেক নারী সুলতানা বেগমের মধ্যে মারামারি শুরু হয়ে যায়। একপর্যায়ে আলেয়া বেগমের মাথার একপাশ দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। অন্য নারীরা তাঁদের মারামারি থামান।

আলেয়া জানান, তিনি বছিলা সেতু–সংলগ্ন এলাকায় দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন। তাঁর স্বামী মারা গেছেন ১০ বছর আগে। টাউন হল বাজার এলাকায় তিনটি বাসায় কাজ করেন। কাজ শেষে বিকেলে আবার নিজের বাসায় ফিরে যান। আজ টিসিবির ট্রাক সেল হবে শুনে কম দামে পণ্য কিনতে এসেছিলেন।

৪৫টি ট্রাকে পণ্য বিক্রি

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির লক্ষ্যে ১১ মে দেশব্যাপী ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চলবে ১০ দিন। ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল ভর্তুকিমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে।

আজ ঢাকা মহানগরীর ৪৫টি স্থানে সাশ্রয়ী মূল্যে ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি।

টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ব্যক্তি এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল ও দুই লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে পারেন। প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ১৪০ টাকা ও দুই লিটার সয়াবিন তেল ২৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তিনটি পণ্যের এই প্যাকেজ কিনতে ৪৮০ টাকা লাগে।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল এখন ৩৯০ টাকা। এ ছাড়া মোটা দানার মসুর ডাল প্রতি কেজি ৯০–১১৫ টাকা, আর প্রতি কেজি চিনি ১০৫–১১০ টাকায় বিক্রি হয়।

চিনি ও মসুর ডালের সর্বনিম্ন দাম ধরলেও ওই তিন পণ্য খোলাবাজার থেকে কিনতে ৬৭৫ টাকা লাগে। সীমিত আয়ের মানুষ টিসিবির ট্রাক সেল থেকে এ তিনটি পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে ১৯৫ টাকা কমে কিনতে পারছেন।