নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি: নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার?
নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার?

বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। চাল, আটা, ময়দা, তেল, চিনি, ডাল, সবজি ও মুরগির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে চরম বিপাকে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। চাল, ডাল, তেল, ডিম, সবজি থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্চে ছিল ৮.৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০.৩৩ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় কেনা যেত, তা কিনতে এখন খরচ করতে হচ্ছে ১০৯ টাকা ০৪ পয়সা। গত বছরের এপ্রিলের পর এটি সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি।

আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় হু-হু করে বাড়ায় মাসের শুরুতেই হিসাব মেলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন ভোক্তারা। বাধ্য হয়ে অনেকেই খাবারের তালিকা ছোট করছেন, ভেঙে খাচ্ছেন জমানো সঞ্চয়। বাজার তদারকিতে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় অসাধু চক্রের পকেট কাটার মহোৎসবে নীরবে পুড়ছে মধ্যবিত্তের সংসার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাজারে দামের হালচিত্র

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা বাড়ায় এক কেজি সরু চাল কিনতে ক্রেতার সর্বোচ্চ ৯০ টাকা খরচ হচ্ছে। ডালের দাম ঠেকেছে ১৬০ টাকা কেজিতে। ৮০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না কোনো সবজি। ডিমের ডজনও ১৫৫ টাকা। সঙ্গে আটা-ময়দা থেকে শিশুখাদ্য সবকিছুর দাম বাড়ায় সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাছ-মাংস কেনা এক প্রকার বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। গরুর মাংসের স্বাদ নিতে হলে কেজিপ্রতি ৮০০-৮২০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়। গরিবের তেলাপিয়া ও পাঙাশের কেজিও ২০০-২৫০ টাকার ওপরে। আর অন্যান্য মাছ কিনতে ৪৫০-৯০০ টাকা গুনতে হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। পাশাপাশি রাজধানীর খুচরা বাজারে তিন মাসের ব্যবধানে কয়েকটি সবজির দাম সর্বোচ্চ ১৬৭ শতাংশ বেড়েছে। রান্নায় ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। ফলে যার আয় বাড়ানোর ক্ষমতা নেই, ব্যয় বাড়ায় তারা সবচেয়ে বিপদে পড়েছে।

তিন মাসের ব্যবধানে দামের তুলনা

বুধবার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকা, যা তিন মাস আগেও ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৮২০ টাকা, যা তিন মাস আগে ৭৫০-৭৮০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, যা আগে ১০০-১০৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে লিটারে ৫ টাকা বেড়ে প্রতিলিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১৯৫ টাকা ছিল। চালের মধ্যে প্রতিকেজি পাইজাম চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকা, যা তিন মাস আগে ৬৫ টাকা ছিল। প্রতিকেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা, যা আগে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা, যা আগে ৬০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা, যা তিন মাস আগেও ২২০ টাকা ছিল। পাশাপাশি রান্না করতে ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৯৪০ টাকা, যা আগে ১৩৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে ক্রেতার নাজেহাল অবস্থা। গত কয়েক মাসে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। তদারকি সংস্থাগুলোও এক প্রকার নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে অসাধুদের ক্রেতার পকেট কাটতে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কেউ কিছু বলছে না। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নীরবে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আর নিম্ন আয়ের মানুষ কোনোমতে টিকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে সরকারের নজরদারি দরকার।

তিনি বলেন, ভোক্তাকে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে। অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। অসাধুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। সেই ব্যয়বৃদ্ধি সমস্যা হতো না, যদি একই হারে আয় বাড়ত। এক্ষেত্রে মানুষ টিকে থাকার জন্য সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে খাচ্ছে। কিন্তু যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের তো কোনো সঞ্চয় নেই। কিংবা কেউ ধারও দেন না। এ অবস্থায় তারা আরও খারাপ অবস্থায় আছেন।

সরকারের অবস্থান

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করতে সরকার একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কারসাজি যাতে কার্যকর হতে না পারে, সে লক্ষ্যেই সরকার কৌশলগত মজুত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সরবরাহ, শৃঙ্খলা, পর্যবেক্ষণ এবং টিসিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ যাতে অবৈধভাবে মুনাফা করতে না পারে সেজন্য আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, জনবলের সংকট রয়েছে, যে জনবল আছে তা পর্যাপ্ত নয়। তবে সব মিলেই ভোক্তার অধিকার রক্ষায় কাজ করা হচ্ছে।