ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামের সোলেমান আলী তৈরি করেছেন স্বল্প খরচের ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র, যা এক খেত থেকে আরেক খেতে নিয়ে সহজেই ব্যবহার করা যায়। তার এই উদ্ভাবন জ্বালানি তেলের সংকট ও লোডশেডিংয়ের দুশ্চিন্তা দূর করে কৃষকদের জন্য আশার আলো দেখিয়েছে।
সোলেমানের সৌর সেচযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য
সোলেমানের তৈরি সৌর সেচযন্ত্রে ১০টি সৌরকোষ রয়েছে, প্রতিটির ক্ষমতা ২৫০ ওয়াট। মোট ২ হাজার ৫০০ ওয়াট ক্ষমতার এই প্যানেল সূর্যের আলো পেলেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, যা দিয়ে তিন হর্সপাওয়ারের পানির পাম্প চালানো হয়। প্রতি মিনিটে ন্যূনতম ৭০০ লিটার পানি তোলা যায়, এক দিনে প্রায় ১০ একর জমিতে সেচ দেওয়া যায়।
খরচ ও সাশ্রয়
ভালো মানের এক ওয়াট সৌরকোষের দাম ২৮ টাকা। সেই হিসাবে ২ হাজার ৫০০ ওয়াটের সৌর প্যানেলের দাম ৭০ হাজার টাকা। পানির পাম্প ও অবকাঠামো তৈরিতে খরচ আরও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
সাধারণ সেচযন্ত্রে প্রতি বিঘায় খরচ হয় সাত থেকে আট হাজার টাকা, সেখানে সৌর সেচযন্ত্রে তা নেমে এসেছে তিন হাজার টাকায়।
ব্যবহার ও আয়
প্রতিটি সেচযন্ত্র ভাড়া দিয়ে বছরে ৩৬ হাজার টাকা করে পান সোলেমান। কেউ কিনতে চাইলে মানভেদে দাম দেড় লাখ থেকে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত শতাধিক সৌর সেচযন্ত্র তৈরি করে বিক্রি করেছেন তিনি। ছয়টি নিজে ব্যবহার করছেন, ভাড়ায় চলে ২০টি।
সদর উপজেলার কৃষক আতাউর রহমান বলেন, "লোডশেডিংয়ের চিন্তা নেই, পেট্রোল-ডিজেলের ঝামেলাও নেই—সময়মতো পানি দিতে পারছি, ফলনও ভালো হচ্ছে। সেচে টাকাও সাশ্রয় হচ্ছে।"
সোলেমানের সৌরশক্তি নির্ভর বাড়ি
সলেমান জানান, "আমার বাড়ির সব কাজই এখন সৌরশক্তি নির্ভর। ওয়েল্ডিং মেশিনটাও সৌরশক্তিতে চলছে। মুরগি-গরুর খামার, হ্যাচারির ভারি ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে চালাই। মুরগির তিনটি শেডে এগজস্ট ফ্যান ও নয়টা সিলিং ফ্যান, মাছের হ্যাচারির পানি তোলা—সবই সৌরশক্তিতে।"
বাড়ির ২০টির ওপরে লাইট, আটটি ফ্যান, ফ্রিজ, এসি, বৈদ্যুতিক চুলা, টেলিভিশনসহ সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চলে সৌরশক্তিতে। আগে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত, এখন তা নেমে এসেছে এক হাজার টাকার নিচে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন বলেন, "উত্তরাঞ্চলে বোরো মৌসুমে লোডশেডিং বেশি। সোলেমানের সৌর সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা লাভবান হবে।"



