রেফারির শেষ বাঁশি বেজে গেছে। টেলিভিশন বন্ধ। কিন্তু আপনার জন্য ম্যাচটা যেন তখনই শুরু। ফোনটা হাতে নিতেই একের পর এক নোটিফিকেশন। বন্ধুদের গ্রুপে মিম, ইনবক্সে খোঁচা, ফেসবুকজুড়ে ট্রলের বন্যা। মনে হচ্ছে, ফোনটা আর না খুললেই ভালো হতো।
পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখলেন, ডেস্কে বসার আগেই সহকর্মীর প্রশ্ন, ‘কাল ঘুম হয়েছে?’ বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে পা রাখতেই কেউ বলে উঠল, ‘আজ এত চুপচাপ কেন?’ পাড়ার চায়ের দোকান, বন্ধুদের আড্ডা, এমনকি পরিবারের ছোট সদস্যটিও হয়তো সুযোগ হাতছাড়া করছে না।
কেন এত কষ্ট লাগে?
একটি দলকে বছরের পর বছর সমর্থন করতে করতে অনেক মানুষ অজান্তেই সেই দলের সঙ্গে নিজের পরিচয়, স্মৃতি আর আবেগ জড়িয়ে ফেলেন। বিশ্বকাপের রাত জাগা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা, জয়ের উচ্ছ্বাস কিংবা আগের টুর্নামেন্টের স্মৃতি—সব মিলিয়ে দলটি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ।
তাই দলের পরাজয় শুধু স্কোরবোর্ডে লেখা একটি ফল নয়; অনেকের কাছে এটি অপূর্ণ প্রত্যাশা, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন কিংবা নিজেরই একটি অংশ হেরে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে। এই কারণেই ম্যাচ শেষে মন খারাপ হওয়া, কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা না করা বা কিছু সময় একা থাকতে চাওয়াকে অস্বাভাবিক বলা যায় না।
ট্রলের ভয়ও চাপ তৈরি করে
মজার বিষয় হলো, অনেক সমর্থক ম্যাচ চলাকালীনই শুধু হার নিয়ে চিন্তা করেন না। তাদের মাথায় ঘুরতে থাকে আরেকটি প্রশ্ন—‘দলটা হারলে কাল অফিসে কী হবে?’, ‘বন্ধুরা কী বলবে?’, ‘গ্রুপে আবার কত মিম আসবে!’ অর্থাৎ, পরাজয়ের কষ্টের পাশাপাশি অনেকের মধ্যে তৈরি হয় সামাজিক অস্বস্তির আশঙ্কাও। আর দল হেরে গেলে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয়।
সব ট্রল এক রকম নয়
বন্ধুদের ঠাট্টা-তামাশা, অফিসের খুনসুটি কিংবা আড্ডার মজা—এসব খেলাধুলার সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু খুনসুটি যখন ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ, কটূক্তি বা বারবার বিব্রত করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সেটি আর বিনোদন থাকে না। তাই প্রথমেই বুঝে নিন, কে মজা করছে আর কে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
সব কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই
হারের পর আবেগ সবচেয়ে বেশি কাজ করে। তখন প্রতিটি ট্রলের জবাব দিতে ইচ্ছা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ অনলাইন তর্কের কোনও ফল হয় না। বরং রাগের মাথায় বলা একটি কথা অনেক দিনের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। কখনও কখনও হেসে উড়িয়ে দেওয়া, বিষয় পরিবর্তন করা বা চুপ থাকা—এগুলোই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া।
ফোনটা কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখুন
ম্যাচ শেষের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত থাকে। এই সময় যদি দেখেন প্রতিটি পোস্টই আপনার বিরক্তি বাড়াচ্ছে, তাহলে নিজেকে একটু বিরতি দিন। কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকলে মনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।
নিজের কষ্টকে ছোট করবেন না
‘এতটুকু খেলার জন্য এত মন খারাপ!’—এমন কথা শুনে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করবেন না। প্রিয় দল হারলে কষ্ট লাগতেই পারে। সেটি স্বীকার করাই বরং স্বাভাবিক। নিজের অনুভূতিকে গ্রহণ করতে পারলে তা কাটিয়েও ওঠা সহজ হয়।
মনে রাখুন, আপনি দল নন
আপনি আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ইংল্যান্ড বা অন্য যে দলেরই সমর্থক হন না কেন, সেই দলের হার আপনার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। একটি ম্যাচের ফল আপনার যোগ্যতা, আত্মসম্মান বা ব্যক্তিত্বের মূল্য নির্ধারণ করে না। এটি মনে রাখতে পারলে ট্রলও তুলনামূলক কম গায়ে লাগে।
খেলার বাইরের জীবনটাও গুরুত্বপূর্ণ
একটি হারের পর সারাদিন মিম দেখে, তর্ক করে বা একই হাইলাইট বারবার দেখে কাটানোর বদলে অন্য কিছু করুন। বন্ধুদের সঙ্গে অন্য বিষয়ে আড্ডা দিন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, হাঁটতে বের হন কিংবা প্রিয় কোনও বই বা সিনেমায় ডুবে যান। মস্তিষ্ককে নতুন কাজে ব্যস্ত রাখলে হতাশার তীব্রতাও ধীরে ধীরে কমে আসে।
ট্রল ক্ষণস্থায়ী, সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী
বিশ্বকাপ শেষ হবে। নতুন টুর্নামেন্ট আসবে। আজ যারা আপনাকে নিয়ে মজা করছে, কাল হয়তো তারাই একই পরিস্থিতিতে পড়বে। তাই একটি ম্যাচের ফল যেন কোনও বন্ধুত্ব, সহকর্মীর সম্পর্ক বা পারিবারিক পরিবেশ নষ্ট না করে।
শেষ কথা
বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের প্রতিযোগিতা নয়, এটি আবেগেরও উৎসব। সেই আবেগেই মানুষ রাত জাগে, উল্লাস করে, আবার কখনও হতাশও হয়। তাই প্রিয় দল হারলে কষ্ট লাগবে, ট্রলের মুখেও পড়তে হবে—দুটোই স্বাভাবিক। তবে সেই কষ্ট যেন নিজের মানসিক শান্তিকে গ্রাস না করে, আর ট্রলের জবাব দিতে গিয়ে যেন সম্পর্কের মাঠে লাল কার্ড না দেখতে হয়।
যারা ট্রল করবেন তাদেরও ট্রলের প্রভাবটাও একবার ভাবা উচিত। আপনার কাছে যেটি নিছক মজা বা খুনসুটি, প্রিয় দল হারানোর পর অন্য কারও কাছে সেটিই অস্বস্তি বা কষ্টের কারণ হতে পারে। খেলাকে ঘিরে বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা খেলাধুলার সংস্কৃতিরই অংশ। তবে সেটি যেন কখনও ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ বা কাউকে ছোট করার প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। খেলা শেষ হয়ে যায় ৯০ মিনিটে, কিন্তু একটি সম্পর্ক নষ্ট হতে সময় লাগে মাত্র একটি মন্তব্য।



