টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাঠে থাকা আউশ ধান, আমন বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, পানের বরজ, আদা-হলুদ ও উদ্যান ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, শুধু আউশ ধানের ১২ হাজার ৭৪৩ দশমিক ১ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে অন্তত কয়েক কোটি টাকার ফসল পানিতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
পাঁচ জেলায় আউশ ধানের ক্ষতি
কৃষি বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ জেলায় মোট ৫৪ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ রয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৪৩ দশমিক ১ হেক্টর জমির ফসল দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আউশ আক্রান্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। এই জেলায় ৩০ হাজার ২২ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারে ৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর আউশের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর। রাঙামাটিতে ৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৭১৭ হেক্টর, খাগড়াছড়িতে ২ হাজার ৫২০ হেক্টরের মধ্যে ১৩৮ হেক্টর এবং বান্দরবানে ১০ হাজার ৯২৩ হেক্টরের মধ্যে ২২৪ দশমিক ৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমন বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি
বন্যায় আউশ ধানের পাশাপাশি আমন বীজতলাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ জেলায় মোট ৫ হাজার ৬৬ দশমিক ৬৭ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ১ হাজার ৮১২ দশমিক ১৬ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে ২ হাজার ৭২১ দশমিক ৬৭ হেক্টর বীজতলার মধ্যে ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারে ৮৯৫ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৪৭০ হেক্টর, রাঙামাটিতে ৪২০ হেক্টরের মধ্যে ১৫৮ হেক্টর, খাগড়াছড়িতে ৯১০ হেক্টরের মধ্যে ২০২ হেক্টর এবং বান্দরবানে ১২০ দশমিক ৯ হেক্টরের মধ্যে ২১ দশমিক ৫ হেক্টর বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজিতে। পাঁচ জেলায় ৩১ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৬৫ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫৯৪ দশমিক ১৭ হেক্টর জমির সবজি দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে ১৭ হাজার ৮২৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে। কক্সবাজারে ২ হাজার ৫১০ হেক্টরের মধ্যে ৯৫৫ হেক্টর, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ২৩৫ হেক্টরের মধ্যে ৯৮৭ হেক্টর এবং খাগড়াছড়িতে ৪ হাজার ৮৫ হেক্টরের মধ্যে ১৪৩ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে। বান্দরবানে ৪ হাজার ৬ হেক্টর সবজির মধ্যে ৪৫০ দশমিক ১ হেক্টর দুর্যোগের কবলে পড়েছে। কক্সবাজারে পান বরজেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলাটিতে ৩ হাজার ৬৫ হেক্টর পান বরজের মধ্যে ১৫৬ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে।
পার্বত্য জেলায় আদা, হলুদ ও উদ্যান ফসলের ক্ষতি
পার্বত্য জেলাগুলোতে আদা, হলুদ ও উদ্যান ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ৩ হাজার ৯৭১ হেক্টর জমির হলুদের চাষাবাদ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫১ দশমিক ১ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া ৩৬ হাজার ৯৮৭ হেক্টর উদ্যান ফসলের মধ্যে ২৪০ হেক্টর আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষকদের ক্ষতি ও তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধু কক্সবাজার জেলাতেই কয়েক হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলাটিতে আউশ ধানে ২০ হাজার ৯৬০ জন, আমন বীজতলায় ৫ হাজার ৬৪০ জন, শাকসবজিতে ১৪ হাজার ৩২৫ জন এবং পান বরজে ৩ হাজার ১২০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনও চলমান। অনেক এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে যে হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রাথমিক। সব তথ্য সংগ্রহ শেষে ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।’



