হাওরের কেটে রাখা আধা পাকা ধানের আঁটি দেখিয়ে আফসোস করছেন কৃষক শরিয়ত উল্লাহ। গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জের জোয়ালভাঙ্গা হাওরে তাঁর এই আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘পরতি বছর ধান পাই ১২০ থাকি ১৩০ মণ। ইবার অর্ধেক ধান পানিতে গেছে। মনরে খালি বোঝ দিবার লাগি আধা পচা ধান কাটছি। এখন বছরের খোরাকি নিয়া চিন্তাত আছি। আমরার একবারের ক্ষতি পোষাইতে পাঁচ বছর টানতে অয়।’
ক্ষতির পরিমাণ ও কারণ
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামের কৃষক শরিয়ত উল্লাহ জোয়ালভাঙা হাওরে আট একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে সাড়ে চার একর জমির ধান কেটেছেন, বাকি সাড়ে তিন একর জমির ধান বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরের ধানের খেত তলিয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাঁর।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি আর ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি ধানখেত তলিয়ে ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
শ্রমিক সংকট ও আধিভাগি চাষ
শরিয়ত উল্লাহ জানান, যখন পানি আসে, তখন শ্রমিক পাননি। তাই নিজে এবং গ্রামের আরও কিছু লোককে নিয়ে ‘আধিভাগিতে’ ধান কেটেছেন। সে অনুযায়ী, কাটা ধানের অর্ধেকই দিতে হয়েছে ওই লোকদের। হাওরে পানি থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনেও ধান কাটা যায়নি।
ধান শুকানোর সমস্যা
অতিবৃষ্টির কারণে কাটা ধান নিয়ে বিপাকে পড়া কৃষক শরিয়ত উল্লাহ জানান, এক সপ্তাহ এই ধান খলায় স্তূপ করে রাখা ছিল। ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের হাওরে কোনো কাজ করতে পারেননি তাঁরা। রোববার রোদ ওঠায় একটা মেশিন এনে ধান মাড়াই করেছেন। এখন শুকানোর চেষ্টা করছেন।
ভেজা ধান হাতে নিয়ে দেখান এই কৃষক। জানালেন, ধান ময়লা হয়ে গেছে। এগুলোতে ভালো চাল হবে না। বেশি দিন স্তূপে থাকায় ধানে একধরনের গন্ধ ধরে গেছে। তাই যেখানে ৩০ শতক জমিতে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান হওয়ার কথা, সেখানে ধান হবে ১০ থেকে ১২ মণ। খলাতেই তাঁর কাটা ধানের অর্ধেকের মতো ক্ষতি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শরিয়ত উল্লাহর পরিবারে স্ত্রী-সন্তান মিলে ছয়জন মানুষ। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলের বয়স ২২ বছর, ছোট ছেলের বয়স ছয়। বাপ-ছেলে মিলেই জমিতে আবাদ করেন। তিনি জানান, এবার নিজের সঞ্চয় বাদে জমি আবাদ করতে বাড়তি ২৮ হাজার টাকা ঋণ করছিলেন। এনজিওর একটি ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি আছে। বৈশাখে ধান তুলেই দেনা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন ঋণ পরিশোধ তো দূরে থাক, কিস্তি চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।
বছরে শরিয়ত উল্লাহর পরিবারে খাবারের জন্য ধান দরকার হয় ৪০ থেকে ৫০ মণ। এ ছাড়া মাসে পরিবারের আনুষঙ্গিক খরচ আছে আরও কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। প্রতিবছর নিজের ঘরের খাবার বাদে ২০ থেকে ৩০ মণ ধান বিক্রি করতেন তিনি। এবার খোরাকিই হবে কি-না, এই চিন্তায় আছেন।
শরিয়ত উল্লাহ এখন চিন্তা করছেন, বয়স যা–ই হোক, সংসার তো চালাতে হবে। এ জন্য শ্রমিকের কাজ করবেন। তিনি বলছিলেন, ‘বৈশাখ মাসে হাওরের খলাত যে আনন্দ থাকে, ইবার এই আনন্দ আমরার মনে নাই। সামনের বছরটাই আমরার নিরানন্দে যাইব।’



