মৌলভীবাজারের হাওরে বোরো ধান কাটার ধুম, ফলন ভালো কিন্তু দামে হতাশ কৃষক
মৌলভীবাজারের হাওরে বোরো ধান কাটার ধুম, দামে হতাশ কৃষক

পানি থেকে ধান কেটে নৌকায় পাড়ে নিয়ে আসা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের কাদিপুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। তখন হাওরপারে লাল ও গোলগাল সূর্যটা ডোবার প্রস্তুতি নিয়েছে। রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়েছে হাওরের বুকে। পানকৌড়ির ঝাঁক ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে নীড়ে ফিরছে। রাখালেরা গরু নিয়ে ফিরছে ঘরে। তখন কেউ বুকসমান পানি থেকে ধান কেটে নৌকা বোঝাই করে পাড়ে ফিরেছেন। কেউ কাঁধভারে কাটা ধানের আঁটি নিয়ে ধানখোলায় আসছেন। কেউ মাথায় খড়ের বিশাল আঁটি নিয়ে ফিরছেন। কেউ খোলায় মেলে দেওয়া ধান জড়ো করছেন। কেউ বস্তায় ধান ভরে ট্রলিতে করে বাড়ির দিকে ছুটছেন।

একটা কর্ম-উৎসবমুখর দিনের শেষে সবকিছু গুছিয়ে তোলার নিঃশব্দ তোড়জোড় অসংখ্য নারী-পুরুষের মধ্যে। মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারে এখন সকাল থেকে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত বোরো ধান গোলায় তুলতে এমন ব্যস্ত সময় চলছে। এবার তুলনামূলক ভালো ধান হয়েছে। ফলন নিয়ে কৃষকদের তেমন কোনো আফসোস নেই। মন বেশ ভালোই। তবে দাম নিয়ে অনেক কৃষকেরই মন খারাপ। উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন অনেকেই।

কৃষকের মুখে হতাশার কথা

গতকাল শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট-নতুন ব্রিজ সড়কের সানন্দপুর এলাকায় কথা হয় কৃষক হান্নান মিয়ার সঙ্গে। তাঁরা পরিবারের চার-পাঁচজন সদস্য মিলে সড়কের একপাশে শুকাতে দেওয়া ধান তুলছিলেন। হান্নান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, 'শ্রমিকের রোজ আট-নয় শ টাকা। ধানের মণ ৮০০ টাকা। আমরা মরছি। গিরস্থি (ধান চাষ) করি কান্দিয়া কুল পাইরাম না (কেঁদে কিনারা পাচ্ছি না)। সরকাররে কওকা (বলেন) হয় ধানর দাম বাড়াইতা (বাড়াতে), নাইলে জিনিসপত্রর দাম কমাইতা (কমাতে)।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধান তোলার কাজে থাকা একজন কিষানি তখন যুক্ত করেন, 'কেমনে বাঁচতাম, এক লিটার তেলর দাম ২০০ টাকা। আমরাতো ধান বেচিয়াই সবতা করি।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, তিনি ও তাঁর ভাই সজ্জাদ মিয়া ৩০ কিয়ার (১ কিয়ার= ৩০ শতাংশ) জমিতে বোরো চাষ করেছেন। এক কিয়ার জমির ধান কাটতে এখন থোক পাঁচ হাজার টাকা শ্রমিকেরা দাবি করছে। এক কিয়ার জমিতে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা খরচ পড়ছে। কিয়ারে ধান পাচ্ছেন ১৬ থেকে ১৭ মণ।

হাওরে ধান কাটার আমেজ

কাউয়াদীঘি হাওরপারের অন্তেহরির দিকে যাওয়ার সময় হাওরে বোরো ধান কাটার ভালোই আমেজ পাওয়া যায়। হাওর থেকে লোকজন ট্রলি, ট্রাক ও ঠেলাগাড়িতে করে ধানের আঁটি, ধানের বস্তা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। সড়কের অনেক জায়গাতেই ধানের খড় বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সড়কের মধ্যে বিছানো ধান গোছানোর কাজ করছেন নারী-পুরুষ। বস্তায় ধান ভরে সড়কের পাশে লাইন ধরে রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন বাড়ির উঠানেও তখন ধান তোলার ব্যস্ততা। কোথাও যন্ত্রে ধানমাড়াইয়ের কাজ চলছে।

সদর উপজেলার কাদিপুর ও রাজনগর উপজেলার অন্তেহরি গ্রামের কাছে হাওরের উঁচু স্থানগুলোতে এখন রীতিমতো মানুষের মেলা বসেছে। কেউ হাওরের দিক থেকে কাঁধভারে ধানের আঁটি নিয়ে খোলার কাছে ফিরছেন। অনেক নারীকে দেখা গেছে মাথায় খড়ের আঁটি নিয়ে আসতে। কম্বাইন হারভেস্টর দিয়ে ধান কাটা হয়েছে। ধান আগেই নিয়ে আসা হয়েছে। এখন গবাদিপশু ও ধান সেদ্ধ দেওয়ার জন্য খেতে পড়ে থাকা খড় নিয়ে আসছেন তাঁরা। পাশাপাশি অনেকগুলো ধানের খোলা; এসব খোলাতে নারী-পুরুষ মিলে মেলে দেওয়া ধান স্তূপ করছেন। কেউ বস্তায় ভরে স্তূপ করে রাখছেন। ঠেলাগাড়ি বা ট্রলি দিয়ে এসব ধান বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

অন্তেহরি গ্রামের রাজন দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, 'হাওরে এক সপ্তাহ ধরি ধান কাটা শুরু অইছে (হয়েছে)। অনেকে বেশি শ্রমিক লাগাই (লাগিয়ে) কাটা শেষ করিলার (শেষ করে ফেলছে)। অনেকে নিজেরা কাটের, তারার অনেক সময় লাগবো।' তিনি বলেন, 'এবার ধান ভালা অইছে। কিন্তু ধানর দাম নাই। এক মণ ধান এক কামলায় (শ্রমিক) লাগি যায় (লেগে যাচ্ছে)। আমরাতো নিজের শ্রম হিসাবে ধরি না, নিজের শ্রম ধরলে এক কিয়ারে ১০ থাকি (থেকে) ১৩ হাজার টাকা খরচ অই যায় (হয়ে যায়)।'

শ্রমিক মজুরি ও ধানের দাম

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, একজন শ্রমিকের রোজ (মজুরি) ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা চলছে। পানির মধ্যে ধান থাকলে মজুরি বেশি দিতে হয়। কিয়ারপ্রতি ধান মিলছে ১৫ থেকে ২০ মণ। ধানের মণ এখন মোটা জাতের ৬০০ টাকা, চিকন ৭০০ টাকা।

কাদিপুর গ্রামের নকুল দেবনাথ বলেন, 'পানির মাঝে ধান কাটারাম। কোনোখানো (কোনো খেতে) বুকপানি, কোনোখানো গলাপানি। কিছু ধান পানির নিচে। ধান রোয়া (রোপণ), সার, শ্রমিকসহ এক মণ ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত খরচ এখন প্রায় ৯০০ থাকি (থেকে) এক হাজার টাকা। এরপরও কিতা করমু (কী করব) খেত না করিতো উপায় নাই। খাইমু কিতা (খাব কী), চলমু কেমনে (চলব কীভাবে)।'

নকুল দেবনাথ জানালেন, তিনি নয় কিয়ার জমিতে ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে চার কিয়ার জমি শুকনাতে আছে। এক কিয়ারের ধান কেটেছেন। পাঁচ কিয়ার জমি এখনো পানির মধ্যে। নকুল দেবনাথ হাওরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'অউ (এই) যে কালা কালা (কালো কালো) কিছু জায়গা দেখরা, এরা কিন্তু মানুষ। নৌকা নিয়া ধান কাটের।'

এই খেত হাওরের অনেকটা নিচের দিকে। বৃষ্টি হয়েছে। হাওরের নিচু অংশে পানি জমে গেছে। এই পানি কমাতে মনু নদ সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউসের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হচ্ছে। তবে বৃষ্টি হলেই পানি বেড়ে যায়। কৃষকেরা জানিয়েছেন, নিয়মিত সেচ দিলে পানি জমবে না। কৃষকেরা ধান কেটে তুলতে পারবেন। কয়েকজন কৃষক তখন পানির মধ্যে থাকা ধান কেটে নৌকা বোঝাই করে পাড়ের কাছে চলে এসেছেন। অনেকটা কাদামাটি ভেঙে তাঁদের কাছে গিয়ে দেখা গেছে, নৌকা থেকে তাঁরা কাঁধভারে করে ধানের আঁটি নিয়ে উঁচু স্থানে জমা করে রাখছেন। অনেকগুলো ধান আঁটির স্তূপ জমা হয়েছে ওই স্থানটিতে। এখানে মাড়াই শেষে ধান নিয়ে বাড়ি ফেরা হবে। রাতে ধানের আঁটিগুলো এখানেই থাকবে। এখানে কেউ রাতে আর থাকেন না। ধান চুরি নিয়েও কোনো আশঙ্কা নেই। এখানে ধান চুরি হয় না।

অন্তেহরি গ্রামের সুধীর নমশূদ্র জানালেন, বুকপানি থেকে ধান কেটে তাঁরা নৌকা বোঝাই করে নিয়ে এসেছেন। কাদিপুরের ধীরেন্দ্র দেবনাথ জানান, তাঁর জমিতে এখন কোমরপানি, পেটপানি। এই ধান কাটতে শ্রমিকের এক দিনের মজুরি ৭০০ টাকা। তিনি দেড় কিয়ার জমির ধান কাটিয়েছেন।

সন্ধ্যার পরও ব্যস্ততা

তখন বেলা আরও পড়ে গেছে। একদল পানকৌড়ি ডানায় সূর্যের লালচে আলো মেখে মালার মতো গ্রামের দিকে উড়ে চলছে। আস্তে আস্তে অন্ধকার ছায়া ফেলছে হাওরের বুকে। নারী-পুরুষসহ শিশুরাও সবকিছু গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সন্ধ্যার পরও এই ব্যস্ততা দেখা গেছে। সবকিছু গুছিয়ে বাড়ি ফিরতে অনেকেরই রাত সাতটা-আটটা বাজবে। এখন দিনরাত বলে আর তাঁদের কাছে আলাদা কিছু নেই।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন আজ শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, 'জেলার হাকালুকি হাওরের নিচু এলাকার ধান কাটা প্রায় শেষ। কাউয়াদীঘি হাওরে সেচের ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতি ডিজেলে চলে। ডিজেল নিয়ে এখনো সমস্যা নেই।' ধানের দাম প্রসঙ্গে উপপরিচালক বলেন, 'সরকার ৩৬ টাকা কেজিতে ধান কিনবে। এ জন্য কৃষককে কাঁচা ধান বস্তায় না ভরে শুকিয়ে রাখতে বলছি। তাহলে তারা ভালো দাম পাবে। খাদ্য বিভাগ ধান কিনবে।' এ বছর সারা জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ প্রথম আলোকে বলেন, 'কাশিমপুর পাম্প হাউস নিয়মিত চলছে। আমরা বিদ্যুৎ বিভাগকে বলেছি ধান কাটার সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে। এখানে কিছু সমস্যা হয়েছে, ধান চাষ করতে করতে কৃষকেরা একেবারে হাওরের নিচে চলে গেছেন।'