রংপুর বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১০ সালে। রংপুর সিটি করপোরেশন হয়েছে ২০১১ সালে। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাস্তবে রূপ নিতে আরও কত দিন লাগবে জানি না। রংপুর বিভাগকে দীর্ঘদিন বৈষম্যের মাধ্যমে যে পিছিয়ে রাখা হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ কি দেবে নতুন সরকার?
বৈষম্যের চিত্র
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রংপুর অঞ্চলে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে। কতটুকু কম দেওয়া হয়েছে, তারও একটি চিত্র সরকার চাইলে বের করতে পারবে। ২০১০ সালের আগপর্যন্ত যেহেতু রাজশাহী বিভাগের অংশ ছিল রংপুরের জেলাগুলো, তাই রংপুরে বরাদ্দের বৈষম্য বের করা কঠিন। ২০১০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বরাদ্দে যে বৈষম্য করা হয়েছে, এই চিত্র বের করা জরুরি। একটি স্বাধীন দেশ অঞ্চলবিশেষে কতটা বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হতে পারে, তা জনসমক্ষে উন্মোচিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে রংপুর বিভাগের বৈষম্যের পরিমাণ সুচারুরূপে শতভাগ বের করা সম্ভব না হলেও মোটাদাগে বৈষম্যের স্বরূপ হাজির করা সম্ভব। কয়েকটি সূচকে দেখাচ্ছি। যেমন প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দ করা হয়। এই বরাদ্দ রংপুর বিভাগের জন্য যা রাখা হয়, তা বিস্ময়কর রকমের কম। উদাহরণ হিসেবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কথা বলা যায়। সে বছর ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তখন রংপুর বিভাগের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল মাত্র দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ১ শতাংশের চেয়ে কম।
দেশে ১০টি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত মহাজোট সরকারের সময়ে। কিন্তু রংপুর বিভাগে এর একটিও গ্রহণ করা হয়নি। দেশে অনেকগুলো অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রংপুর বিভাগে কেবল ঘোষণা দিয়েই কাজ শেষ করা হয়েছে। একটিও আলোর মুখ দেখেনি। দেশের যে সিটি করপোরেশনগুলো আছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ থাকে রংপুরের জন্য। উন্নয়ন বাজেটে ‘শূন্য’ টাকা বরাদ্দের বাস্তবতাও ঘটেছে অনেকবার।
নদী ও শিক্ষা খাতে অবহেলা
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নদী সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নতুন কোনো প্রকল্প রংপুর বিভাগের জন্য গ্রহণ করা হয়নি। অথচ এই সময়ে কেবল রংপুরের নদীগুলোয় ক্ষতি হয়েছে লাখ লাখ কোটি টাকার সম্পদ। উজানের দেশ থেকে বাংলাদেশে যে পানি প্রবেশ করে, তার অন্তত ৮০ শতাংশ আসে এই বিভাগ দিয়ে।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছর হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ে ১০ বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। সেই বরাদ্দের পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের কাজ টাকার অভাবে শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তখন এক টাকাও বরাদ্দ দেয়নি। অথচ তুলনামূলক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েও হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। দেশের বিভিন্ন এলাকায় রেলের উন্নয়ন হলেও রংপুর থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য রেলপথ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
ক্ষতিপূরণের উপায়
ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, মেগা প্রকল্প, বিশেষ প্রকল্প, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে বরাদ্দসহ যতটা সম্ভব তুলনামূলক চিত্র প্রস্তুত করতে হবে। এরপর দীর্ঘকাল বঞ্চিত করে রাখা বিভাগের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নির্ধারণ করতে হবে। রংপুরের মানুষের অধিকার ক্ষতিপূরণ পাওয়া। কেউ তো ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছে না। একটি অঞ্চলের ক্ষতিপূরণ দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
যেভাবে ক্ষতিপূরণ হতে পারে, তার একটি ধারণা দিচ্ছি। যেহেতু রংপুরে কোনো মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি, তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ব্রহ্মপুত্রের ওপর একটি সেতু স্থাপন করে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের দূরত্ব কমিয়ে আনা যেতে পারে। সেই সেতুর সঙ্গে রেলপথ থাকবে। জেলায় জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করতে হবে। রংপুর সিটি করপোরেশনসহ রংপুর বিভাগের পৌরসভাগুলোতে ব্যাপক বরাদ্দ দিতে হবে, যাতে দীর্ঘকাল বঞ্চিত নাগরিকেরা ন্যায্য অধিকারটুকু পায়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও পর্যাপ্ত বরাদ্দ চাই। রংপুর-কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের সঙ্গে রেলপথে ব্রডগেজ যুক্ত করতে হবে। রংপুর থেকে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। রংপুর অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে।
সরকারের দায়িত্ব
সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই ক্ষতিপূরণ সম্ভব। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আমরা দেখেছি অনেক মৃত সরকারি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, টাকাও দেওয়া হয়েছে। যে দেশে মৃত ব্যক্তিরও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়, সে দেশে জীবন্ত দুই কোটি মানুষের ক্ষতিপূরণ সরকার দেবে না, তা তো হয় না। রংপুর অঞ্চলের মানুষেরও ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। বর্তমান বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার যদি এ কাজ করে, তাহলে এটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
শেখ হাসিনা রংপুরের পুত্রবধূ হিসেবে রংপুরের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রংপুরকে এক নম্বর জেলা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সময়ে রংপুরে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা সারা দেশের তুলনায় অনেক কম এবং অন্তর্বর্তী সরকার রংপুরের উন্নয়নের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। আমরা দীর্ঘ বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ চাই।
তুহিন ওয়াদুদ: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক



