রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি। এছাড়াও এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়নি। পরিবর্তন হয়নি ক্ষতিপূরণ আইন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শ্রমিক অধিকারকর্মী ও গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের সঙ্গে কথা হয়েছে বাংলা ট্রিবিউনের। রানা প্লাজা ধসের ঘটনার সঙ্গে কারা দায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের বর্তমান অবস্থান ও পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের করণীয়সহ নানান বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের বর্তমান অবস্থা
তাসলিমা আখতার বলেন, রানা প্লাজাতে ১১৭৫ জন প্রাণ হারায় এবং সব মিলিয়ে ২ হাজার ৫০০ জন আহত হন, পঙ্গু হন। এই ১৩ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এই খাতের অনেক উন্নয়ন হয়েছে, ভবনের উন্নয়ন হয়েছে, শ্রম আইনের পরিবর্তন হয়েছে, শ্রমিকদের বেতনের পরিবর্তন হয়েছে। তবে শ্রমিকদের জীবনমানের খুব পরিবর্তন হয়নি। এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের আইনটা বদল হয়নি। তখন ছিল এক লাখ, দেড় লাখ, তারপর পরিবর্তন হয় ২ লাখ, আড়াই লাখ হয়। কিন্তু দুই-আড়াই লাখ টাকা কোনও মানুষের ক্ষতিপূরণ হতে পারে না।
দোষীদের শাস্তি ও বিচার প্রক্রিয়া
দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে মামলাগুলো ঝুলে আছে। নানা যুক্তি দেখানো হচ্ছে, সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলা হচ্ছে। কিন্তু যা পাওয়া গেছে সেটাই যথেষ্ট ছিল মামলাগুলো ফলো করার জন্য, সেটা করা হয়নি। অনেকেই আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন বা কাজে ফিরে গেছেন। বিশেষ করে আহত পঙ্গুদের অনেককেই দীর্ঘমেয়াদে হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে বা কোথাও চাপা পড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি রয়েছে। যারা বেঁচে আছে তাদের দুই রকম ক্ষতি হয়েছে: শারীরিক-মানসিক ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক জীবনের ক্ষতি।
ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
ক্ষতিগ্রস্তরা আইন অনুযায়ী পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাননি। এক-দেড় লাখ টাকা পাওয়া গেছে, আর বিদেশি ব্র্যান্ডরা রানা প্লাজা এগ্রিমেন্ট নামে একটি আয়োজন করেছিল, সেটা থেকে তারা একটি অনুদান দিয়েছে। এই অনুদানটা এক ধরনের সাহায্য, অধিকার নয়। কেউ হয়তো ৫ লাখ টাকা পেয়েছে, কেউ ১০ লাখ। একেকজন একেক রকম পেয়েছে। সেটাকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ হিসেবে জাস্টিফাই করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক সহায়তা দুই রকম ছিল: বিদেশি বায়াররা এবং অলায়েন্স নামে দুটি উদ্যোগ, যা বাংলাদেশের ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার জন্য এসেছিল। তাসলিমা আখতার মনে করেন, অনুদানের বদলে আইনি সহযোগিতা করা উচিত, যেখানে সরকার, মালিক এবং বিদেশি বায়ারদের দায়িত্ব নির্ধারণ করে কীভাবে ক্ষতিপূরণ করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করা উচিত। জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশনে কীভাবে অধিকার তৈরি করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে হবে।
পুনর্বাসনের ঘাটতি
পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে যারা কাজ করার উপযোগী, তারা যাতে কাজে ফিরে যেতে পারে, এবং যাদের কাজ করার অবস্থা নেই, তারা যে ধরনের কাজের জন্য প্রস্তুত সেই ধরনের কাজের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। যারা আপনজন হারিয়েছে, তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। পুনর্বাসন মানে কাজের নিশ্চয়তা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা, জীবনমান উন্নয়ন করা। প্রথম দিকে বিজিএম কিছু চিকিৎসাব্যবস্থা করছিল, কিন্তু এটি শুধু বিজিএমের একার দায়িত্ব নয়, মালিক এবং সরকার উভয়পক্ষ এবং বায়ারদেরও সংযুক্ত করা পুনর্বাসনের কাজে খুব জরুরি।
সংগঠনের ভূমিকা ও সমন্বয়ের অভাব
রানা প্লাজায় ১ হাজার ১৭৫ জনের প্রাণহানির পর অনেক দেশি-বিদেশি অর্গানাইজেশন কাজ করে, অনেক দেশীয় সংগঠন বা এনজিও তৈরি হয়। অনেকে পুনর্বাসনের কথা বলে ট্রেনিং দেয়, যেমন দোকানের ট্রেনিং, পশুপালন ট্রেনিং, সেলাইয়ের ট্রেনিং। কিছু সংগঠন টাকাও দিয়েছে। তাসলিমা আখতার মনে করেন, এমন কর্মসূচি যা মানুষকে নির্ভরশীল করে ফেলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। সমাধান হলো দোষীদের শাস্তি, ক্ষতিপূরণের আইন বদল, এবং আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও দায়িত্ব গ্রহণ। স্মৃতির জায়গাগুলো সুরক্ষা করা জরুরি, কিন্তু টাকা সমাধান নয়। সমন্বয় করে কাজ করলে অনেক কিছু সহজেই করা যেতো।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
এই ঘটনার জন্য দায়ী মালিক পক্ষ, সরকার এবং বিদেশি বায়ার। তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা ছিল না। মালিকরা জানতো যে ভবনে ফাটল আছে, তারপরও তারা শ্রমিকদের বাধ্য করছে যাওয়ার জন্য। ৬ তলা ভবন করার অনুমোদন ছিল কিন্তু ৯ তলা করা হয়। কল-কারখানা অধিদফতর তদারকি করে না, লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। ভবনটির ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেছে। ভবন তৈরি হয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্য দিয়ে। বিদেশি বায়ারদের দায় হলো বায়িং প্র্যাকটিস স্বচ্ছ রাখা, কোথা থেকে ক্রয় করছে, সেই কারখানার মান যাচাই করা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে পোশাক খাতে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্ব সরকার, মালিক ও বিদেশিদের।
ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়ানোর পদক্ষেপ
শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। ক্ষতিপূরণ বেশি হলে এবং শাস্তি নিশ্চিত হলে মালিকরা সতর্ক হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা পরিদর্শনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রতিনিয়ত তদন্ত করা হলে ঘটনা রোধ করা যায়। লাইসেন্স নবায়ন, ভবন আইন মানছে কিনা, তা তদারকি করতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়
একেকজন একেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই সবার জন্য এক নয়। তবে বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণ সবচেয়ে জরুরি। রানা প্লাজা বিশ্ব ইতিহাসে একটি বড় হত্যাকাণ্ড, যাকে 'স্ট্রাকচারাল কিলিং' বলা হয়। সাভারে রানা প্লাজার জায়গাটি প্রিজারভ করা হয়নি। শ্রমিকদের স্মৃতি ও ইতিহাস রক্ষার জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। কোনো ডাটাবেজ নেই, উদ্যোগ নেওয়া হলেও অগ্রগতি নেই।
রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা
যেকোনো দেশে সরকার কতটা গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব, তার মাপকাঠি হলো ওই দেশের শ্রমিকদের অবস্থা। এখন গণতান্ত্রিক চর্চার পথে এগোচ্ছি, পোশাক শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে হবে, তাদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার তদারকি করবে, মালিকরাও ভূমিকা রাখবেন। বিদেশিদেরও দায়িত্ব নিতে হবে, যাদের পোশাক তৈরি করছে তাদের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। সরকার, মালিকপক্ষ, বিদেশি বায়ার এবং শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠকদের একসঙ্গে কাজ করা দরকার।
রানা প্লাজার মূল আসামি রানার জামিন
রানা জামিন পাননি। জামিন পাওয়ার কথা ছিল, কয়েকটি মামলায় জামিন পেয়েছিল কিন্তু সবগুলোতে না পাওয়ায় বের হতে পারবে না। জেলেই আছে।



