বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ফোটা নতুন চালতা ফুল দেখে মুগ্ধ হয়েছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন তরুপল্লবের নিয়মিত ‘গাছ দেখা গাছ চেনা’ কর্মসূচির ৪০তম আয়োজন উপলক্ষে ৭ মে ঢাকা থেকে একটি দল ময়মনসিংহে পৌঁছায়। সবাই তরুপল্লবের সদস্য হলেও নানান বয়স ও পেশার মানুষ ছিলেন। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের গাছগুলো আরও সবুজ হয়ে উঠেছিল। চারপাশে জারুল, সোনালু ও কৃষ্ণচূড়ার উচ্ছ্বাস প্রকৃতির মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে সবাইকে।
গাছ চেনানোর কার্যক্রম
সকালের প্রাতরাশ সেরে সবাই জড়ো হন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানে গাছ চেনানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও উদ্ভিদ-গবেষক আশরাফুজ্জামান প্রমুখ। তাঁদের নেতৃত্বে শুরু হয় গাছ চেনানোর কার্যক্রম। উদ্যানের বিভিন্ন অংশে ঘুরে ঘুরে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বুদ্ধনারকেল, স্বর্ণ অশোক, হলুদ, কইনার, পাখিফুল, কুচিলা, সুন্দরী, বর্মীশিমুল, গিলালতা, ডাকুর, লতাকাঞ্চন, মহুয়া, বানরকলা, বার্ড অব প্যারাডাইস, চালমুগরা, বাঁশপাতা, কুম্ভি, পবন ঝাউ, পাইন, রসকাউ, চাপালিশ, পালাম, গগনশিরীষ, অর্কিড, পাহাড়ি কদম, নতুন চালতা, চিকরাশি, উদাল, হাড়গজাসহ আরও অনেক উদ্ভিদের সঙ্গে।
জার্মপ্লাজম সেন্টার পরিদর্শন
জার্মপ্লাজম সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে কফি, বন কাঁকরোল, গোলাপজাম, লটকন, ম্যাংগোস্টিন, পিচ, আলুবোখারা, রাম্বুটান, পার্সিমন, ফলসা, করোসল, দেশি গাব, কাউ, ডেউয়া, তইকরসহ বিচিত্র ধরনের ফল দেখে মুগ্ধ হন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এর মধ্যে একেবারে নতুন ধরনের একটি চালতা দেখে চমৎকৃত হন সকলে। আগে কোথাও দেখা যায়নি। এত দিন দেশে তিন ধরনের চালতার খবর জানা ছিল। এবার আরেকটি যোগ হলো। ছোট গাছ হওয়ায় হাতের নাগালেই চমৎকার ফুলগুলো ফুটেছিল।
নতুন চালতার বৈশিষ্ট্য
উদ্ভিদ-গবেষক অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান ২০১৩ সালে গাছটি এই গার্ডেনে রোপণ করেন। ২০১৬ সাল থেকে গাছটিতে ফুল ফুটতে শুরু করে। তিনি বলেন, ‘কুঁড়ি অবস্থায় ফুলগুলো ৫টি মাংসল বৃত্যংশ দ্বারা আবৃত থাকে। লক্ষণীয়ভাবে কুঁড়িগুলো ফুলতে থাকে এবং ফুল ফোটার আগের দিন হলুদ রং ধারণ করে। রাত তিনটার দিকে ফুল ফোটা শুরু হয়ে সূর্যোদয়ের এক ঘণ্টা আগে পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়। পরাগায়নের পর বিকেল চারটার মধ্যে পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে। রাতের মধ্যেই বৃত্তাংশগুলো ক্ষুদ্র ফলকে ঢেকে রাখার জন্য আবার ভাঁজযুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃত্তাংশ লাল বর্ণের হয়। ফুল থেকে ফলে পরিণত হতে ৩৫ দিন সময় লাগে।’
বৈজ্ঞানিক নাম ও বিস্তার
এই চালতার কোনো বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নাম Simpoh Air। বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia suffruticosa। এটি মালয়েশিয়া, সুমাত্রা এবং বোর্নিও দ্বীপের মাঝারি আকারের চিরসবুজ বৃক্ষ। ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা উপবৃত্তাকার থেকে ডিম্বাকার, ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার এবং ১২ থেকে ২০টি শিরাযুক্ত, আগা গোলাকার থেকে ভোঁতা এবং গোড়া ভোঁতা, গোড়া বৃন্তের ডানার সঙ্গে সংযুক্ত। পাতার বোঁটা ২ থেকে ৬ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটার চওড়া, পর্যায়ক্রমে ১৮টি ফুল ফোটে। পুষ্পবৃন্ত ১ থেকে ৩ সেন্টিমিটার। বৃতি উল্টো-ডিম্বাকার, ১৫ থেকে ২২ মিলিমিটার। পাপড়ির রং স্নিগ্ধ হলুদ, ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার। ফুলগুলো লম্বা বৃন্তে নিচের দিকে মুখ করে ফোটে। কোনো গন্ধ বা মধু নেই। মৌমাছি, ছোট গোবরে পোকা, ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো মাছির মাধ্যমে এদের পরাগায়ন হয়। পরাগায়নের পর ফল ধরার সময় ফুলগুলো ওপরের দিকে মুখ করে থাকে এবং ফলগুলো সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হতে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে।
ফলের সৌন্দর্য ও ব্যবহার
পরিপক্ব ফল ৭ বা ৮টি রশ্মিযুক্ত একটি তারকা-আকৃতির ক্যাপসুল, এটি গোলাপি রঙের এবং কিনারা সাদা। শাঁস টকটকে লাল এবং এতে বেগুনি বা হালকা বাদামি রঙের বীজ থাকে। গর্ভপত্র ৫ থেকে ৮টি, ১০ মিলিমিটার লম্বা গর্ভদণ্ড, প্রতিটিতে ৭ থেকে ১০টি ডিম্বক থাকে। ফল বিদীর্ণ হয়, বৃতি পশ্চাৎমুখী, গর্ভপত্রগুলো ছড়ানো, লাল রঙের। গাছটির ফলের সৌন্দর্য ফুলের চেয়ে কম না! ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফল দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন ফুল। এ বছর ফুল দেখে সেই ভুল ভাঙল।
গোলাপি রঙের তারকাকৃতির ক্যাপসুলের মতো ফলটি সূর্যোদয়ের অনেক আগেই রক্তবর্ণের বীজসহ পুরোপুরি খুলে যায়। তখন ফলটির পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ফলবীজ বুলবুলি পাখি এবং বানরের খুব প্রিয়। যে কারণে খোলা ফলে বীজ পাওয়া খুবই দুষ্কর।
সাধারণত ক্ষত সারাতে এবং রক্ত পড়া বন্ধ করতে ব্যবহৃত হয়। বড় এবং শক্ত পাতাগুলো খাবার মোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। শুকনো পাতায় সিলিকা থাকায় সিরিশ কাগজ হিসেবে ব্যবহার্য। এই উদ্ভিদ থেকে স্তন ক্যানসারের প্রতিষেধক তৈরির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন গবেষকেরা।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক



