বৈশাখে শীতলপাটি ফুলের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য
বৈশাখে শীতলপাটি ফুলের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য

রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বৈশাখের সকালে দেখা মিলল শীতলপাটি ফুলের অনন্য সৌন্দর্য। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'খাঁটি সোনা' কবিতায় বর্ণিত শীতলপাটির মতোই এক অদ্ভুত শীতলতা মন ও দেহকে জুড়িয়ে দেয়। বৈশাখের ভ্যাপসা গরম থেকে মুক্তি মেলে এই শীতলপাটি বনে এসে।

পদ্মপুকুর পাড়ের সৌন্দর্য

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পদ্মপুকুর পাড়টি চমৎকার। পুকুরের জল পদ্মপাতার আবরণে ঢাকা, ফাঁক দিয়ে লাল পদ্মের কুঁড়ি উঁকি দেয়। উঁচু ডালে বসে কোকিল ডাকছে, মনে হয় বসন্ত এখনো ফুরায়নি। পুকুরপাড়ে যেতেই শীতলপাটির শীতল পরশ পাওয়া যায়। ছোট ছোট সাদা প্রজাপতির মতো ডানা মেলে শীতলপাটির সাদা ফুলগুলো আকাশে উড়তে চায়। লম্বা ডোবামতো জায়গায় ঘন ঝোপ করে রয়েছে অনেক শীতলপাটি গাছ, ফুলে ফুলে ভরা। ফুলের মঞ্জরিদণ্ডের মাথা সুচের মতো সুচালো ও খাড়া। ফুলে ঘ্রাণ না থাকলেও আছে শুভ্র-সুন্দর পবিত্রতা ও শীতলতা।

ঐতিহাসিক ঐতিহ্য

বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ আওরঙ্গজেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে উপহার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলার শীতলপাটি। বাদশাহ তা পেয়ে ভীষণ খুশি হন এবং শীতলপাটি বিছিয়ে তাতে নামাজ পড়তেন বলে শোনা যায়। ১৮৭৬ সালে রানি ভিক্টোরিয়া ভারত সম্রাজ্ঞী উপাধি ধারণ করার পর তাঁর পছন্দের জিনিসগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল শীতলপাটি। রাজপ্রাসাদেও স্থান পেয়েছিল এটি। বিদেশিরা দেশে ফিরে যাওয়ার সময় বাংলায় আসার প্রমাণ হিসেবে শীতলপাটি ও মসলিন বস্ত্র নিয়ে যেতেন। ২০১৭ সালে ইউনেসকো শীতলপাটিকে অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। কথিত আছে, দক্ষ কারিগরেরা এমন নিপুণ হাতে শীতলপাটি বোনেন যে তার ওপর দিয়ে সাপও চলতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উদ্ভিদতাত্ত্বিক বিবরণ

শীতলপাটি তৈরি হয় শীতলপাটি গাছ থেকে। টাঙ্গাইল ও সিলেটের স্থানীয় ভাষায় একে মুর্তা বা মূর্ত্তা বলা হয়; অন্য নাম পাটিপাতা, পাটিবেত, মুক্তাপাতাগাছ। চট্টগ্রামে পাটি-জং, বরিশালে পাইটরাবন, নোয়াখালীতে মোস্তাক নামে পরিচিত। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Schumannianthus dichotomus, ম্যারান্টেসি গোত্রের। ইংরেজি নাম 'কুলম্যাট'। গাছ দেখতে বাঁশের কঞ্চির মতো, গাঢ় সবুজ, শক্ত, গিঁটওয়ালা ও শাখায়িত বহুবর্ষজীবী গুল্ম। তিন থেকে পাঁচ মিটার লম্বা হয়। গোড়ায় আদার মতো মোথা বা রাইজোম জন্মে, যা থেকে গাছ হয়। পাতা উপবৃত্তাকার, সূক্ষ্মাগ্র, চকচকে ও গাঢ় সবুজ। পুষ্পমঞ্জরি সরল, বসন্ত-গ্রীষ্মকালে ফুল ফোটে। ফুল সাদা, পাপড়ি সরু, আয়তাকার, অগ্রভাগ গোলাকার বা ভোঁতা। নিচু ও ডোবা, ছায়াময় স্যাঁতসেঁতে জায়গায় এ গাছ হয়।

ঔষধি গুণ

জার্নাল অব মেডিসিনাল স্টাডিজ-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে তৃণা চৌধুরী ও সাথি গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, এ গাছের কন্দ বা রাইজোম জ্বর সারাতে ও কানের ব্যথা কমাতে ব্যবহৃত হয়। এ গাছ ব্যথানাশক, অ্যান্টিডায়াবেটিক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকলাপ প্রদর্শন করে। থাইল্যান্ডের চিংয়াং মাইতে এর ফুল থেকে সকালে জলের ফোঁটা সংগ্রহ করে চোখের কিছু সমস্যা নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়।

বর্তমান অবস্থান

সিলেটের জামালগঞ্জে প্রচুর শীতলপাটি গাছ আছে। এছাড়া টাঙ্গাইলের নাগরপুর, ঝালকাঠি, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ফেনী, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরেও দেখা যায়। কবি আরণ্যক বসুর মতো মনে হয়, 'বুকের মধ্যে মস্তো বড় ছাদ থাকবে/ শীতলপাটি বিছিয়ে দেব;/ সন্ধে হলে বসবো দু'জন।' কিন্তু কলের পাটির কারণে শীতলপাটির ঐতিহ্য আর ধরে রাখা যাচ্ছে না।