হাওরে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতির পরিমাণ চালের হিসাবে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন, যা বোরো মৌসুমের মোট উৎপাদনের প্রায় ১ শতাংশ। তবে বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গত তিন-চার দিনে পাইকারি বাজারে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে এখনো প্রভাব পড়েনি।
ধান চাষ ও ক্ষতির পরিমাণ
এ বছর হাওরে মোট ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ। গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন কৃষক। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাত জেলায় ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সুনামগঞ্জে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেত্রকোনায় এবং তৃতীয় স্থানে কিশোরগঞ্জ।
দাম বাড়ার কারণ
বোরো মৌসুমের শুরুতে চালের দাম কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু মৌসুমের মাঝখানে ডিজেল সংকটে সেচ বিঘ্নিত হওয়া এবং শেষ দিকে বৃষ্টি ও ঢলে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, নতুন চালের চাহিদা কম থাকলেও দাম বাড়ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রেজা বলেন, 'বোরো মৌসুমে চালের দাম কমে। এবারও অনেকটা কমছিল। সেটা এখন বাড়ছে।' বাবুবাজারের শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক কাওসার রহমান বলেন, নতুন সরু চাল পুরোনো চালের চেয়ে কেজিতে ১০ টাকা কমে বিক্রি হলেও এখন আবার ৪-৫ টাকা বেড়েছে।
বর্তমান চালের দাম
বাবুবাজারে নতুন মোটা চাল ৪৫-৪৬ টাকা, পাইজাম ও বিআর-২৮ চাল ৫১-৫২ টাকা, মিনিকেট ৬০-৬৬ টাকা এবং নাজিরশাইল ৭০-৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবির হিসাবে খুচরা বাজারে মোটা চাল ৪৮-৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৫২-৬৮ টাকা এবং সরু চাল ৭০-৮৫ টাকা কেজি।
সরকারি সহায়তা
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এতে মোট ১৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার জানান, মে, জুন ও জুলাই—এই তিন মাস আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি চলবে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, চালের দাম বাড়লেও কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সামনে চাল মালিকদের সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে এবং বাজারে চালের সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি সরকারের চালের মজুত ১২ লাখ ৫০ হাজার টনের নিচে নামতে না দেওয়ার পরামর্শ দেন। বর্তমানে সরকারের মজুত রয়েছে ১২ লাখ ৬১ হাজার টন।
বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক পণ্যমূল্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে চালের দাম চার মাস ধরে স্থিতিশীল রয়েছে, টনপ্রতি ৩৫০-৪০০ ডলারের মধ্যে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে চাল আমদানি নিষিদ্ধ না রেখে নির্দিষ্ট শুল্কে উন্মুক্ত রাখা উচিত, যাতে বাজার স্থিতিশীল থাকে।
দেশে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৪ শতাংশ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, চালের দাম যাতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।



