সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১১ বছর ধরে অপরিবর্তিত থাকার পর অবশেষে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের পর এটাই নবম পে স্কেল। অতীতে দুটি পে স্কেলের মধ্যে এত দীর্ঘ ব্যবধান কখনো দেখা যায়নি। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন পে স্কেলের যৌক্তিকতা রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন স্তরের চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকা বা বড় শহরে তাদের আয়ের সিংহভাগ চলে যায় বাসাভাড়ার পেছনে।
অর্থমন্ত্রীর আশা বনাম বাস্তবতা
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ালে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। পাসপোর্ট, পুলিশ, স্বাস্থ্য, ভূমি—যেকোনো সরকারি সেবা নিতে গেলে নাগরিকদের ঘুষ দিতে হয়। জনপ্রশাসন ও সরকারি সেবার প্রতিটি স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তাই ‘অভাব থাকলে দুর্নীতির প্রবণতা থাকে’—অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পে স্কেলের ইতিহাস
বাংলাদেশে প্রায় সব সরকারের আমলেই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সাধারণত নতুন সরকার আসার শুরুতে বা শেষ দিকে নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় পে স্কেলের পর ২০১৫ সাল পর্যন্ত আটটি পে স্কেল হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, আকর্ষণীয় বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরির প্রতি ‘যোগ্য ও দক্ষদের’ আকর্ষণ বাড়বে এবং দুর্নীতি কমবে।
দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
বাস্তবতা কিন্তু সেই যুক্তির ধারেকাছেও নেই। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৮ থেকে ২৩-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। ২০১৫ সালে বেতন বাড়ানোর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে কিছুটা উন্নতি হলেও এরপর অবনতি ঘটে। ২০২১ সালের পর ধারাবাহিকভাবে অবনতি হতে থাকে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৩তম। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের (৪২) চেয়ে অনেক নিচে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভুটান ৭১ স্কোর নিয়ে এগিয়ে, ভারত ও মালদ্বীপের ৩৯, শ্রীলঙ্কার ৩৫, নেপালের ৩৪, পাকিস্তানের ২৮ স্কোর। একমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্কোর (১৬) বাংলাদেশের নিচে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠিত হয়। সেই কমিশন গ্রেড ভেদে ৮০-১৪০ শতাংশ বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করে। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি তিন অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে: প্রথম দুই অর্থবছরে ৫০ শতাংশ করে মূল বেতন, তৃতীয় অর্থবছরে ভাতা। আগামী ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রশাসনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা গতবারের তুলনায় প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব চ্যালেঞ্জ
প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি টাকা আসবে কোথা থেকে? বিএনপি সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে, যেখানে ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। দেশে কর-জিডিপি বছরের পর বছর ৮ শতাংশের নিচে। নতুন অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের আশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ভাষায় ‘মিরাকল’ ছাড়া আর কিছু নয়। ঘাটতি মেটাতে বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ ও ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বেসরকারি খাত ও কর্মসংস্থান
রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশি বিনিয়োগকারীরা পকেটের টাকা বের করতে ভরসা পাচ্ছেন না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বিপুল বিনিয়োগে আগ্রহী নন। সরকারকে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে আরও বেশি টাকা ঋণ নিতে হবে। বাজেটে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অর্থ বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ পাবে না, ফলে কর্মসংস্থান হবে না, মানুষের আয় বাড়বে না এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
তরুণদের বেকারত্ব ও প্রত্যাশা
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের দাবি ছিল মুখ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, প্রতি বছর ২৪ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে ২৪ হাজারের জন্যও ডিসেন্ট চাকরির সুযোগ নেই। সরকারি চাকরিতে বড়জোর ২-৩ শতাংশ তরুণের চাকরি হয়। বাকিরা বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমান বা দেশে অনিশ্চিত জীবনযাপন করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে ৭-২০ লাখ টাকা খরচ করেও ১৫ হাজার টাকার চাকরি জোটানো কঠিন।
দুর্নীতির শিকড় ও সংস্কারের অভাব
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান পর্বের ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের অনুদার গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী শাসন মিলে দুর্নীতির শিকড় গভীর। হাসিনা আমলে ব্যবস্থাটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির হিসাব বলছে, হাসিনা আমলের সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা। এই দুর্নীতিতে রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী—সবাই জড়িত। ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে দুর্নীতি কমানোর আশা ‘দিনের স্বপ্ন’ মাত্র।
সংস্কারের অগ্রগতি
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই জনপ্রশাসন সংস্কার আমলাদের বিরোধিতায় মুখ থুবড়ে পড়ে। পুলিশ ও দুদক সংস্কারের উদ্যোগও কাটছাঁট করে বনসাই বানানো হয়। নির্বাচিত সরকার এসে দুদক ও বিচার বিভাগ সংস্কার ‘ডিপ ফ্রিজে’ রেখেছে। সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় ধরে দুদক কমিশনহীন।
উপসংহার
প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক থাকলে আস্থা ক্রমে ফিকে হয়ে আসে। সরকারের ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান যত বেশি থাকবে, তার মাশুল সাধারণ মানুষকেই গুনতে হবে।



