ধনী ও করপোরেটদের কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার বহাল রাখার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হবে। রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজে অধিবেশনের ২৩তম দিন প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কর ফাঁকি রোধে সরকারের পদক্ষেপ
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদা এবং গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ. কে. এম. ফজলুল হক মিলনের পৃথক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। বিকাল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি কমাতে এবং ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও ঝুঁকি-ভিত্তিক নিরীক্ষাসহ একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে করদাতাদের তথ্যভান্ডার সম্প্রসারণ, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ও প্রণোদনা
একই সঙ্গে চলমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রাখা, উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর ফাঁকি বন্ধে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। কর আদায় ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে করপোরেট করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে করদাতাদের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে এপিআই সংযোগের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ চলছে।
ঝুঁকি-ভিত্তিক নিরীক্ষা ও অনলাইন কর কর্তন
অর্থমন্ত্রী জানান, কোন খাত থেকে কত পরিমাণ রাজস্ব আসার কথা, তা যাচাইয়ে শিল্পভিত্তিক গড় সূচক ব্যবহার করে ঝুঁকি-ভিত্তিক নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনে উৎসে কর কর্তন ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান অবস্থা
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কমতে শুরু করে এবং ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালের অক্টোবরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন অভিঘাতে তা আবার বেড়ে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার মনে করছে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় কারণ সরবরাহ সংকট। এ কারণে উৎপাদন ও বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থায়ন
অর্থমন্ত্রী জানান, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করবে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।



