২০২৬-২৭ বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য কী আছে? করমুক্ত সীমা ও করহারের বিস্তারিত
২০২৬-২৭ বাজেট: ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত সীমা ও করহারের বিস্তারিত

প্রতি বছরের বাজেট ঘোষণার আগে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে আগ্রহ থাকে সরকার কেমন বাজেট ঘোষণা করবে। ৮০-এর দশকে স্কুলে পড়াকালীন সময়ে লোকেরা বলাবলি করতো আজ বাজেট ঘোষণা হবে। বাজারের বড় চায়ের দোকানে মানুষ মাথা উঁচু করে টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখতো অতি আগ্রহ নিয়ে। তখন মানুষ বিটিভির মাধ্যমে বাজেট শুনতো এবং সরকারের ভালোমন্দ নিয়ে টুকটাক আলোচনা হতো। সেই বাজেটের সংবাদের দর্শকদের মধ্যে শিক্ষক, কৃষক, মুদি দোকানদার, চা-বিক্রেতা, রিকশা শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক প্রভৃতি শ্রেণির মানুষও ছিলেন। বড় হয়ে শহরে এসে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বাজেটের সময় মানুষের আগ্রহ আরও অধিকতর পর্যায়ে দেখতে পেলাম। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সাথে বাজেটের সম্পর্ক বুঝতে পেরে গ্রামের সাধারণ গৃহ থেকে শহরের বড় অট্টালিকা পর্যন্ত সকলেই বুঝতেন তাদের জন্য বাজেট কতটা প্রয়োজন।

করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি

সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত সীমা কিছুটা বৃদ্ধি করে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই করমুক্ত সীমা শুধুমাত্র ২০২৬-২৭ কর বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। এতে সাধারণ করদাতারা কিছুটা উপকৃত হবেন বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। তবে করমুক্ত সীমা নির্ধারণে সরকারের কোনো গবেষণা আছে কিনা, তা বাজেট প্রস্তাবে বলা নেই।

বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত সীমা

বিগত বছরের মতো এ বছরও বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমায় কিছু সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতার জন্য ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি করদাতার জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা ও গেজেটভুক্ত গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ এর আহত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতা, পিতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমার নির্ধারিত অঙ্কের সাথে বাড়তি ৫০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভবিষ্যতের করমুক্ত সীমা

এই প্রস্তাবনায় আগামী ৫ বছরের জন্য নিম্নে বর্ণিত করমুক্ত সীমাও ঘোষণা করা হয়। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবছরের জন্য সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত সীমা হবে ৪ লাখ টাকা এবং পরবর্তী কর বছর ২০৩০-৩১ এর জন্য করমুক্ত সীমা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রস্তাবিত করহার

ক্রম/ধাপ নির্ধারিত আয়ের অঙ্ক ও করহার: প্রথম ধাপ ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ০ শতাংশ, পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ২৫ শতাংশ, পরবর্তী অবশিষ্ট অঙ্কের ওপর ৩০ শতাংশ।

সারা বছর রিটার্ন জমার সুবিধা

রিটার্ন জমা ও সময় বৃদ্ধি প্রতি বছর এক ধরনের বাড়তি ঝামেলা থেকে মুক্তির জন্য সারা বছরই রিটার্ন জমার সুবিধা উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে তা করদাতাগণ ব্যবহার করতে পারবেন। সারা বছরকে ৪টি কোয়ার্টারে বিভক্ত করা হয়েছে— জুলাই-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর-ডিসেম্বর, জানুয়ারি-মার্চ ও এপ্রিল-জুন।

প্রথম কোয়ার্টার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে মোট প্রদেয় করের ০.২৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যে অঙ্কটি কম সেই পরিমাণ কর ছাড় পাবেন। দ্বিতীয় কোয়ার্টার অক্টোবর-ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে মোট প্রদেয় কর যা আসে সেই পরিমাণ অঙ্ক দিলেই হবে। অর্থাৎ এই কোয়ার্টারে করদাতা কোনো ছাড় পাবেন না। তৃতীয় কোয়ার্টার জানুয়ারি-মার্চ এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে মোট প্রদেয় করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যে অঙ্কটি বেশি সেই পরিমাণ অঙ্ক জরিমানা দিতে হবে। অর্থাৎ এই ধাপে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাকে কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। চতুর্থ কোয়ার্টার এপ্রিল-জুন এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে মোট প্রদেয় করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যে অঙ্কটি বেশি সেই পরিমাণ অঙ্ক জরিমানা দিতে হবে। অর্থাৎ এই ধাপে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাকে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এই প্রস্তাবনায় করদাতারা ঠিক করবেন তিনি কখন রিটার্ন জমা দেবেন। এটা অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

টিআইএন বাধ্যতামূলককরণ নিয়ে বিতর্ক

টিআইএন এর বাধ্যবাধকতা এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় একটি আলোচিত বিষয় হলো, ব্যাংক একাউন্ট খোলা বা সচল রাখতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবনা। এই সিদ্ধান্তটি সরকার কীভাবে বাজেট প্রস্তাবনায় নিয়ে আসলো, তা বোধগম্য নয়। কারণ ইনক্লুসিভ অর্থনীতির মানদণ্ডের বিচারে প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এখনও অনেক দূরে। নানান কারণে মানুষকে ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। যেমন— একজন সাধারণ, ছিন্নমূল মানুষ বা প্রান্তিক বর্গাচাষি বা বিধবা নারী বা স্বামী পরিত্যক্ত নারী সামাজিক সুরক্ষার অংশীজন হিসেবে সরকারি ভাতা নেওয়ার জন্য একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। তাহলে তার টিআইএন কেন নিতে হবে? এভাবে নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ আছেন, যাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার অনেক নিচে। তাহলে তাদেরও বা কেন টিআইএন দরকার হবে। বিষয়টি পরিষ্কার নয়। আবার একটি টিআইএন নিলে বন্ধ করার প্রক্রিয়াও আইন মোতাবেক অতি সহজ নয়। তাহলে নাগরিকদের অযথা একটি ঝামেলায় ফেলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ দেখা যায় না। তবে এটা করা যেত, যারা ব্যবসায়িক হিসাব খুলবে, তাদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা। তা হলেও কিছুটা সহনীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত হতো। আশা করি, সরকার এ বিষয়ে বিবেচনা করবে।

সরকারের ব্যয়ের বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব বৃদ্ধির বিকল্প নেই। একইসঙ্গে এই রাজস্ব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া এবং কৌশল যেন নাগরিকদের জীবনমানের ঘাটতি তৈরি না করে, সেই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি।

লেখক: আয়কর আইনজীবী
[email protected]