বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬.৮% নির্ধারণ
বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে মে পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমানো হলো।

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) আগের মতোই ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল মঙ্গলবার মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে মুদ্রানীতি প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান, নুরুন নাহারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে বর্তমানে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

স্ট্যান্ডিং সুবিধার হার অপরিবর্তিত

মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার (রেপো) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এছাড়া আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে এ সুদহার প্রযোজ্য হয়। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ডেপুটি গভর্নর জানান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি লক্ষ্য

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই নীতিগত অবস্থানের ফলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) ইতিবাচক উদ্দীপনা দেখা যাবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতিও ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। মুদ্রানীতি ঘোষণায় বলা হয়েছে, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতি করেছে। অর্থাত্ মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা

গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি সোমবার জারি করা হয়েছে। নতুন এ নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে রয়েছে, ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আমরা কিন্তু এখন আর পুনঃতফসিলিকরণ একেবারেই উত্সাহিত করছি না।

দুটি নতুন আইন প্রস্তুত

গভর্নর আরো জানান, আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। সরকারের কাছে প্রস্তাব, যেন এই আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়। বর্তমানে অর্থঋণ আদালত বা অন্যান্য আদালতে মামলাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চলে। সেই সুযোগ কমানোর জন্যই এই সুপারিশ বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। এই আইন পাশ হলে ২০২৭ সালে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পাবে। নতুন আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ক্ষতিকর সম্পদ নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নিজেদের আর্থিক বিবরণীতে রাখা যাবে না, বরং তা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হবে।

শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি

ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যে কোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্টকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, যে কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তি সর্বোচ্চ হবে। আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিই দেওয়া হবে।

ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকা ধার

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চলমান নানা জল্পনা-কল্পনা ও গুঞ্জন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ব্যাংকটি নিয়ে অতিরিক্ত ‘স্পেকুলেশন’ বা অনুমাননির্ভর আলোচনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অনুরোধ জানান তিনি। ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার (লিকুইডিটি সাপোর্ট) তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যাংককে মোট ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই সহায়তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। গভর্নর বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম চার মাস কোনো ব্যাংককে লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে হয়নি। এটিকে আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক বলা যায়। তবে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে ১৩ হাজার কোটি টাকা লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে কোনো সিদ্ধান্তই আইনের বাইরে গিয়ে নেওয়া হবে না।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৭ সালে বাড়ানোর লক্ষ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের অন্যতম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ৬ দশমিক ৮ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের জুনে ৮ শতাংশে পৌঁছাবে।

সরকারি ঋণনির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত

মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৫-এ ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। পরে তা ডিসেম্বর ২০২৫-এ বেড়ে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জুন ২০২৬-এ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। নতুন প্রক্ষেপণে ডিসেম্বর ২০২৬-এ এটি ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুনে ১৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

অর্থ সরবরাহে সতর্ক সম্প্রসারণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ব্রড মানি বা অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৬-এর ১০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ডিসেম্বর ২০২৬-এ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জুন ২০২৭-এ ১৩ শতাংশে উন্নীত হবে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইলেও অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। অর্থাত্ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর কৌশলই অনুসরণ করা হবে।

বৈদেশিক সম্পদে আশাবাদ

মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণে নিট বৈদেশিক সম্পদে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের উন্নতি এবং বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় এই সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।