বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের প্রত্যাশা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে জোরালো দাবি পেশ করেছেন। বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী, বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা খাতের বর্তমান সংকট, দুর্নীতি, এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য: জবাবদিহি ও সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে লুণ্ঠন ও দুর্নীতি হয়েছে, এবং জবাবদিহির অভাব ছিল। তিনি উল্লেখ করেন যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের ভোটে দায়িত্ব নিয়েছে এবং প্রতিটি কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রমজান ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সৌরবিদ্যুতের উচ্চ খরচ স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনলাইনে একটি ক্যালকুলেটর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে গৃহস্থালি বা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের ধারণা পেতে পারে। আগামী পাঁচ বছরে মূল চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। রামপাল বা আদানি চুক্তি নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং জনগণের স্বার্থ লঙ্ঘিত হলে তা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ক্যাবের দাবি: সেবা খাত হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত নয়, মুনাফামুক্ত সেবা খাত হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তিনি ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি দারিদ্র্য দূরীকরণ, এবং লুণ্ঠন প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

আলম আরও উল্লেখ করেন যে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি, এবং অনেক সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে। তিনি বিচার বিভাগের সক্রিয়তা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, জ্বালানি খাতের সংকটে সাধারণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি প্রবেশাধিকার, ক্রয়ক্ষমতা, এবং প্রাপ্যতার ওপর জোর দেন। গ্রামাঞ্চলে নারীরা রান্নার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন, এবং বায়োগ্যাস, এলপিজি, বা উন্নত রান্নার যন্ত্রের ব্যবহার তাদের জন্য সীমিত।

কবির আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির কর্মশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১০ শতাংশ, যা বিশ্ব গড় ২৪ শতাংশের চেয়ে কম। তিনি জেন্ডার-রেসপন্সিভ নীতি প্রণয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও সংকট মোকাবিলা

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি যুদ্ধ পরিস্থিতিকে জটিল করছে, এবং রাষ্ট্র করপোরেট মুনাফার স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে। তিনি জনগণের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন, এবং আদানির মতো চুক্তি থেকে বের হওয়ার কঠিনতা উল্লেখ করেন। মজহারের মতে, সংকটের ভেতরেও আলোচনা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে বিকল্প পথ নির্মাণ সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষতা বৃদ্ধি

সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে দুই মাসের রিজার্ভের ওপর নির্ভরশীল, এবং গ্যাস ও তেলের মজুত সীমিত। তিনি ১০ থেকে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও সরকারি নীতির সমন্বয়ের আহ্বান জানান।

আইনি হস্তক্ষেপ ও কাঠামোগত সংস্কার

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, প্রশাসনিক সংস্কার একা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, এবং আইনগত পর্যবেক্ষণ ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি এলপিজি মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা এবং বিআরসির দুর্বলতার উদাহরণ দেন। ক্যাবের বিভিন্ন মামলা ও আইনি উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা

ক্যাব যুব সংসদের সদস্য নাজিফা তাজনূর ও সাদমান সাকিব খান বলেন, নতুন সরকারের কাছে জ্বালানি খাতকে সেবা খাত হিসেবে ঘোষণা করা, দুর্নীতিবাজদের বিচার, এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। তারা আগামী পাঁচ বছরে ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান

সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়নে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন, এবং প্রশাসনিক সংস্কার একা যথেষ্ট নয়। তিনি সরকারের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার আশা প্রকাশ করেন। বৈঠকে ক্যাবের ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে জ্বালানি খাত সংস্কার, দুর্নীতি দমন, এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসাহিতকরণ অন্তর্ভুক্ত।

এই গোলটেবিল বৈঠক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন যে সরকারের পদক্ষেপ জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।