বাংলাদেশে জ্বালানি মজুত সন্তোষজনক, তবে আমদানি সংকটের শঙ্কা
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, যা দেশের তাত্ক্ষণিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে বর্তমানে কোনো সংকট নেই। তবে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ১০০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়।
বিপিসির মজুত তেলের বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমান মজুত তেলের হিসাব নিম্নরূপ:
- ডিজেল: ১১ দিনের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত
- পেট্রল: ১২ দিনের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত
- অকটেন: ২৫ দিনের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, “প্রিমিয়াম তেলের ক্ষেত্রে আমাদের দাম জুন পর্যন্ত নির্ধারিত। বিশ্ববাজারের ওঠানামা এই মুহূর্তে আমাদের ওপর তেমন প্রভাব ফেলছে না। তবে বিকল্প উৎস এবং ক্রয় পরিকল্পনা এখন আমাদের প্রধান দৃষ্টি।”
প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজি সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাব
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি হয়। এর মধ্যে ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে, বাকিটা ওমান ও খোলা বাজার থেকে আমদানি করা হয়। ইরানের হামলার পর কাতার গ্যাস উৎপাদন স্থগিত রাখায় শিল্প ও কৃষি খাত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
এলপিজি খাতেও সংকট দেখা দিতে পারে। দেশে বার্ষিক এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৪ লাখ টন, অর্থাৎ প্রতি মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন, যা সম্পূর্ণভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির মাধ্যমে আসে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও সুপারিশ
বাণিজ্যিক ও কৃষি খাতে সমস্যা এড়াতে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রয়োজনে বেশি দামে হলেও বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি করা জরুরি। সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “স্পট প্রাইসে তেল ক্রয় করতে হবে। উৎস বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত দ্রুত বিকল্প আমদানি চ্যানেল তৈরি করা এবং মজুত বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে জ্বালানি মজুত বর্তমানে সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আমদানি নির্ভরতার কারণে ভবিষ্যতে সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
