জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

ন্যূনতম গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরুর জন্য নির্বাচন শেষ করে সরকার গঠনসহ নানামুখী কার্যক্রম চলবে, এটাই সবার প্রত্যাশা ছিল। আর এই সব কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য হবে— সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা, এটাই ছিল সবার আকাঙ্ক্ষা। ইরানের ওপরে আমেরিকা ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে জ্বালানির সংকট— আমাদের দেশেও অর্থনৈতিকভাবে নতুন ধরনের সংকট তৈরি করেছে, এটা ঠিক। এই সংকটে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়াটাই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু হচ্ছে কি?

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা

দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে আমদানি নির্ভর করে তোলা হয়েছে। এই জ্বালানি খাতে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিকল্প পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি দেশের গ্যাস অনুসন্ধান উৎপাদন ও সরবরাহে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যান্য খাত রয়েছে উপেক্ষিত।

একটা সংকট নতুন একটা সুযোগের পথ উন্মুক্ত করে। তাই সংকট সমাধানে দেশের স্বার্থরক্ষাকারী বিশেষজ্ঞ ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে আশু সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ বের করা ও কার্যকর ভূমিকা নেওয়াটাই ছিল যেকোনও দায়িত্বশীল সরকারের কর্তব্য। সরকার সে পথে না হেঁটে তালগোল পাকিয়ে ফেললো।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিপিসির তথ্য-উপাত্তে অস্পষ্টতা

বিগত দিনে লাভ করা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য-উপাত্ত বোঝা মুশকিল। শুরুতে সরকার বলেই চললো, কোনও সংকট নেই। সর্বকালের সর্বসেরা মজুত আছে। খবর বেরুলো, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন দেশের উৎপাদিত অকটেন ও পেট্রোল কেনা কিছু দিনের জন্য বন্ধ রাখছে। কারণ পাম্পে রাখার জায়গা নেই। আর তেল পাম্পগুলোর অবস্থা ভিন্ন। মানুষ এ ধরনের অবস্থা আগে কখনও দেখেনি। রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে রাস্তাঘাট বন্ধ করে তেল নিতে হচ্ছে। আবার তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে মানুষকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষি ও শিল্পের সংকট

কৃষি শিল্পের দুঃসহ অবস্থা। মৎস্যজীবীদের সংকট সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়লো না। শহুরে আলোচনায় এগুলো প্রাধান্য না পেলেও কৃষি একটা সংকট-পর্ব অতিক্রম করছে।

জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধি

এর মাঝে সরকার অস্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলো। দেশে উৎপাদিত পেট্রোল অকটেনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হলো। আর শুধু এপ্রিল মাসেই ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস, যা দেশের মানুষ রান্নার চুলা হিসেবে ব্যবহার করে, সেই গ্যাসের দাম ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হলো। বাজারের হালতো সবাই জানেন। সেখানে বৃদ্ধি আরও বেশি।

এই বৃদ্ধির প্রভাব ১৯ এপ্রিল থেকেই পড়তেই শুরু করেছে। ২০ এপ্রিল সকালে এর প্রভাব সর্বত্র লক্ষ্য করা গেলো। ক্ষুব্ধ মানুষের অসহায় আর্তনাদের ছাপ সর্বত্র।

পত্রিকার শিরোনামে সংকটের চিত্র

২০ এপ্রিল পত্রিকার প্রথম পাতার হেডলাইনগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেখানে বলা হচ্ছে, ‘তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর সরবরাহ বাড়ালো বিপিসি’, ‘পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেল সংকট তৈরি হচ্ছে’, বিপিসির তথ্য শুনে মনে হচ্ছে— তারাও যেন দাম বাড়ানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। সর্বশেষ তথ্য দেখা যায়, এখনও পর্যন্ত এই সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

তেল বাদে অন্যদিকে নজর দিয়ে দেখা গেলো পত্রিকার শিরোনাম, ‘কিট সংকটে হাম পরীক্ষা কম হচ্ছে, শনাক্ত কম’, ‘দৈনিক পরীক্ষার সক্ষমতা ৩০০ থেকে ৪০০। কিট স্বল্পতায় দৈনিক পরীক্ষা হচ্ছে ১২০’, ‘পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে’। বাস ভাড়া, লঞ্চ ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিতে সর্বত্র মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্র। এটা দৈনন্দিন সংকটের অতি সামান্য খতিয়ান।

দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি

এ অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ তার জীবনের প্রতি মুহূর্তে চলার পথের হিসাব মিলাবে কেমন করে? বিগত দিনগুলোতে এমন কী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও দারিদ্র বেড়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে।

যে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ আমাদের দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাদের কথা একটু মনে করুন? কৃষকের ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে, অথচ উৎপাদিত পণ্যের লাভজনক দাম পাচ্ছেন না। শহরে মানুষরা বেশি দামে পণ্য কিনলেও কৃষক প্রকৃত দাম পায় না। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দাম কমানো ও লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে সরকারের কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।

শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করাসহ সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তায় পদক্ষেপ দেখছি না।

সরকারের প্রণোদনা ও রেশন ব্যবস্থা

হ্যাঁ, এটা ঠিক সরকারের বয়স মাত্র ৬৫ দিন অতিক্রম করছে। এ সময় সরকার সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু মানুষকে সরাসরি কিছু প্রণোদনা দেওয়ার কাজে হাত দিয়েছে, দৃশ্যমান করেছে। কিছু নগদ টাকা এসব মানুষের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু এটা তো ভাবতে হবে ওই টাকা দিয়ে বা তার আয়ের টাকা দিয়ে স্বল্প মূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারবেন কি? দীর্ঘদিন ধরে সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল। অন্ততপক্ষে দরিদ্র মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর কোনও উদ্যোগ আলোচনাই নেই।

এবার হিসাব মিলিয়ে দেখুন, যদি রেশন ব্যবস্থা চালু না করা যায়, কৃষকের ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো এবং লাভজনক দাম নিশ্চিত না করা যায়, বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করা যায়, তাহলে এই সামান্য অর্থ প্রণোদনা মানুষের সংকট সমাধানে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ভূমিকা রাখবে?

সরকারের ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক সংকটে দেখা গেলো, তেল সংকটের সময় সরকার মজুতদার মুনাফাখোরদের ঠেকাতে পারলো না। ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে করতে পারলো না। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসিও দায়িত্বশীল আচরণ করলো না। সরকারের মন্ত্রীদের অহেতুক কথাবার্তায় লাগাম টেনে ধরা গেলো না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে মূল্য বৃদ্ধির ধারা যে ধেয়ে আসছে, তা কীভাবে সামলাবে সরকার?

সাধারণ মানুষের পকেট মোটা থাকলে না হয় বেশি দিন পকেট কেটে চলতে পারবে। আর যদি পকেট পাতলা থাকে, তাহলে কতদিন এই মানুষ মেনে নেবে?

সাধারণ মানুষের শক্তি

তারপরও মানুষ টিকে থাকবে, তার নিজস্ব শক্তি জাগ্রত করে সংকট সমাধানে ভূমিকা নিতে সরকারকে বাধ্য করবে এবং এগিয়ে যাবে। এই সাধারণ মানুষের শক্তিকে জাগ্রত করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স: রাজনীতিবিদ