দেশে অকটেনের সংকট যেন শেষ হচ্ছে না। সরকার বলছে পর্যাপ্ত মজুত আছে, ডিলাররা বলছেন সরবরাহ কম, আর পাম্পে গিয়ে দেখা যাচ্ছে অকটেনের জন্য লম্বা লাইন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল নিয়ে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনও কাটেনি। তেলের দাম বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণার পরেও ঢাকায় অকটেনের জন্য ভোগান্তি কেন—এমন প্রশ্ন উঠেছে।
ত্রিমুখী সমস্যা
বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, অকটেন সংকটের নেপথ্যে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ভোক্তাদের আতঙ্ক ও অতিরিক্ত চাহিদা; দ্বিতীয়ত, মজুতদারি ও কালোবাজারে বিক্রি; এবং তৃতীয়ত, বিপিসির তেল বিক্রয় ব্যবস্থাপনা। মার্চ মাসে সরকার তেল রেশনিংয়ের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়। পরে রেশনিং বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও পাম্পে গিয়ে ক্রেতারা পূর্ণ চাহিদার তেল পাচ্ছেন না।
পাম্পে লাইন ও রেশনিং
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে তেলের জন্য অপেক্ষমান মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, 'এই মহাসড়কের দুই পাশে অনেক পাম্প, তার মধ্যে মাত্র দুইটায় তেল দিচ্ছে। এত পাম্প বন্ধ কেন?' ঢাকার আসাদগেট এলাকায় দুটি পাম্পের সামনে সকাল দশটায় দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পাম্প কর্মী সোহরাব হোসেন জানান, তিনি ২৯ বছর ধরে কর্মরত। তিনি বলেন, 'ফুয়েল পাস থাকলে মোটরসাইকেলে ১০০ টাকার তেল দিচ্ছি, প্রাইভেটকারে ২ হাজার টাকা, বড় গাড়িতে ৩ হাজার টাকা। সবাই যাতে পায়, তাই রেশনিং করছি।'
সোনারবাংলা পাম্পে রাত দশটা থেকে অপেক্ষমান চালক হৃদয় বলেন, 'সবশেষ ১৫ তারিখে অকটেন নিয়েছি, তখন ২ হাজার টাকার তেল দিয়েছিল। দাম বাড়ানোর পরেও লাভ হয়নি।' আরেক চালক ফিরোজ সন্দেহ করেন, 'অকটেন সংকটের কারণ সিন্ডিকেট। অনেক মোটরসাইকেল ও গ্যাসের গাড়ির চালক তেল নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে।' তাঁর কথার সত্যতা পাওয়া গেছে আগারগাঁও এলাকায়, যেখানে গাড়ি থেকে অকটেন নামাতে দেখা গেছে এবং প্রতি লিটারের দাম চাওয়া হয়েছে ২৫০ টাকা।
সরবরাহ কম, মজুতদারি বেশি
সরকারও অসাধু ব্যবসা ও মজুতদারির অভিযোগ করছে। গত দেড় মাসে অভিযান চালিয়ে ৫ লাখ ৭৭ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে অকটেন ৪১ হাজার ৮৪৬ লিটার। তবে মোটরসাইকেল চালকরা দাবি করেন, 'ছয়-সাত ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিয়ে খুব কম লোকই বিক্রি করে। বাস্তবতা হলো দেশে অকটেনের সরবরাহ ঘাটতি আছে।'
বিপিসির অকটেন বিক্রয় তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলের তুলনায় চলতি এপ্রিলের প্রথম ১৯ দিনে দৈনিক গড়ে ৪৩ টন (৫৫ হাজার লিটার) অকটেন কম বিক্রি হয়েছে। তবে মার্চের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে দৈনিক ২৬ টন (৩৩ হাজার লিটার)। যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর বরাদ্দপত্রে দেখা যায়, ৭৮টি ডিলার পাম্পের মধ্যে ২৮টি এপ্রিলের প্রথম ১৬ দিনে অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ পেয়েছে, যার অধিকাংশই ঢাকা ও আশপাশের জেলায়। অন্যদিকে, ১০টি পাম্প এক লিটারও পায়নি, যার ৯টি ঢাকার বাইরে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, 'পাম্প মালিকরা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন তেল পাচ্ছেন না, কিন্তু অফিসিয়ালি বলছেন না। এই তথ্যের অস্বচ্ছতা সরকারকেই দূর করতে হবে। সরকার দাবি করছে তেল আছে, কিন্তু সরবরাহে ব্যর্থতা রয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'পুরো সাপ্লাই চেইনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। পেট্রোল পাম্প, বিতরণ কোম্পানি ও বিপিসি যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না।'
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে জানিয়েছেন, দেশে ২৫ হাজার ৪২৩ টন অকটেনের মজুত রয়েছে এবং আরও ২৭ হাজার টন নিয়ে একটি জাহাজ জলসীমায় রয়েছে। তিনি বলেন, 'প্যানিক পারচেজের কারণে চাহিদা বেড়েছে। আমরা তেল সরবরাহ বাড়িয়েছি—অকটেনে ২০%, ডিজেলে ১০%, পেট্রোলে ১০%। আগামী দেড় মাস চলতে পারবো।' তবে পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, প্রাইভেটকারে ২০ লিটার ও মোটরসাইকেলে ৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ উৎকোচ দিয়ে বেশি তেল নিতে পারছেন।
মন্ত্রী বলেন, 'সবাই মিলে সচেতন না হলে কালোবাজারি চলতেই থাকবে।' পাম্প মালিকদের সংগঠন মনে করে, টানা এক সপ্তাহ সব পাম্পে সরকার ঘোষিত বাড়তি তেল সরবরাহ করলে সংকট কেটে যাবে।



