জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ফিলিং স্টেশনে ভোগান্তির অবসান হয়নি, দেশজুড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা চলছে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ফিলিং স্টেশনে ভোগান্তি অব্যাহত

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ফিলিং স্টেশনে ভোগান্তির অবসান হয়নি

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ফিলিং স্টেশন থেকে তেল পেতে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চলা ভোগান্তির অবসান হবে বলে আশা করেছিলেন অনেকে। পাশাপাশি সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা, ফুয়েল পাস চালু, নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের চার দিন পরও সেই অবস্থার অবসান হয়নি। এখনও জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় চালকদের। রাজধানীসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনে এখনও তেল নিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় সীমিত সরবরাহের কারণে অপেক্ষার সময় বাড়ছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

রাজধানীতে এখনও তিন-চার ঘণ্টার অপেক্ষা

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্প ঘুরে ভোগান্তির নানা চিত্র দেখা যায়। বিকালে নীলক্ষেতের মোড়ের পেট্রোল পাম্পে দেখা যায়, তেল পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে মোটরসাইকেল চালকদের। মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে ভোর ৬টায় দাঁড়িয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় তেল পাওয়ার কথা জানালেন সজিব ইসলাম রিফাত নামে একজন রাইডার। একই কথা জানিয়েছেন অন্য চালকরাও।

বেসরকারি চাকরিজীবী তানজিলুর রহমান নাবিল বলেন, ‘সকালে সিটি, ক্লিন, এসআর, রয়েল পাম্প ঘুরে কোথাও তেল পাইনি। শেষে দুপুর দেড়টায় সিটির লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেলাম বিকাল ৪টায়।’ এই অভিযোগ দেশজুড়ে। তবে আগের মতো সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। রাতভর থাকতে হচ্ছে না। কিন্তু এখনও তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মিজানুর রহমান রতন বলেন, ‘সরকার সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে এর কোনও মিল নেই। আমরা এখনও রেশনিংয়ের মতোই তেল পাচ্ছি। ফলে রাজধানীর অনেক পাম্প দুপুরের পর বন্ধ হয়ে যায়। কোনও পাম্প তেল পাচ্ছে বিকালে। ফলে সকালে এসব পাম্প বন্ধ থাকে। সরকারি ঘোষণার পরও তেল না পেয়ে চালকরা আমাদের ওপর ক্ষেপে যাচ্ছেন। অথচ আমাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছে না। আমরাও চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি না।’

ময়মনসিংহ ও বরিশালে একই অবস্থা

তেলের দাম বাড়লেও ময়মনসিংহের পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল নেওয়ার জন্য চালকদের দীর্ঘ লাইন আগের মতোই রয়েছে। বুধবার নগরীর দিগারকান্দা সওদাগর পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকে চালকদের মাঝে তেল সরবরাহ করা হয়েছে। ভোর থেকে চালকরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সকাল ৮টার পর তেল দেওয়া শুরু হয়। কয়েকশত চালককে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে দেখা গেছে।

মোটরসাইকেল চালক কামরুজ্জামান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়লেও এর কোনও প্রভাব পাম্পগুলোতে পড়েনি। আগের মতোই চালকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।’ আরেক চালক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘ভোরবেলায় সওদাগর ফিলিং স্টেশনে এসে দেখি কয়েকশত মোটর বাইক চালক লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমিও তাদের পেছনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি দুই ঘণ্টা ধরে। এখনও তেল পাইনি। আরও ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে হয়তো তেল নিতে পারবো। তেলের দাম বাড়লেও এর কোনও প্রভাব পড়েনি। আগের মতো একই অবস্থায় আছে।’

এখনও বরিশালের পেট্রোল পাম্পগুলোতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়ায় চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। তবে আগে মোটরসাইকেল চালকদের রেশনিং পদ্ধতির বাইরে যে তেল নেওয়ার প্রবণতা ছিল, তা কিছুটা কমে এসেছে। কমেছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইনও। বড়-ছোট যানবাহনে চাহিদা রয়ে গেছে আগের মতো।

রাজবাড়ী ও খুলনায় কিছুটা উন্নতি

রাজবাড়ীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় কিছুটা কমতে শুরু করেছে। কয়েক দিন আগেও যেখানে ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভোগান্তির চিত্র ছিল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে চালকদের। আগের দিনের তুলনায় অপেক্ষার সময় কমেছে। তুলনামূলক এক ঘণ্টার মধ্যে তেল মিলছে।

খুলনার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ২২ এপ্রিল থেকে তেল সরবরাহ বেড়েছে। মোটর সাইকেলসহ যানবাহনে তেল বিক্রির লিমিট আর নেই। যার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই পাচ্ছেন। কিন্তু মোটরসাইকেলের লাইন এখনও কমেনি। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আগের যেখানে চার-পাঁচ ঘণ্টায় থাকতে হতো।

নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে অব্যাহত ভোগান্তি

নারায়ণগঞ্জে এখনও দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছেন নীরব আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দাম বাড়ার পরও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আগে থেকে সিরিয়াল দিতে হয়। আগের তুলনায় তেল সংকট কমলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে তেল কিনতে হয়। তেল সংকটের সময়ে খোলা বাজার থেকে ২০০-২৫০ টাকা দিয়েও জ্বালানি তেল কিনেছি।’

গাজীপুরের প্রতিটি পাম্পে ভিড় আগের মতোই আছে। যেদিন যে পাম্পে তেল দেওয়া হবে তার ১০-১২ ঘণ্টা আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে যানবাহন এবং বাইক চালকরা নির্দিষ্ট সময়ের ৮-১০ ঘণ্টা আগে থেকেই ওই পাম্পে সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।

চট্টগ্রাম ও সিলেটে কিছুটা স্বস্তি

বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোতে কিছুটা কমেছে যানবাহনের লাইন। আগে যেখানে সাত-আট ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করে তেল পাওয়া যেতো, বর্তমানে ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষার পর মিলছে। কিছু কিছু ফিলিং স্টেশনে অকটেন মিললেও সংকট দেখা দিয়েছে ডিজেলের। এমনটাই জানিয়েছেন কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক।

তেলের দাম বাড়ার পর সিলেটের পাম্পগুলোতে চালকদের চাপ আগের চেয়ে কমেছে। অনেকে প্রয়োজন ছাড়া তাদের যানবাহন রাস্তায় বের করছেন না। এ কারণে পাম্পগুলোতে ভিড়ও কমেছে। নগরীর আখালিয়াঘাটের বাসিন্দা পান্না দাস বলেন, ‘দাম বাড়ার পর তেল কেনার জন্য আর পাম্পে যাইনি। আগে লোড করা তেল দিয়েই মোটরসাইকেল চালাচ্ছি। প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছি না।’

সিলেট বিভাগীয় জ্বালানি তেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ব্যারিস্টার রিয়াশাদ আজিম হক আদনান জানান, দাম বাড়ার পর গ্রাহকদের চাপ কিছুটা কমেছে। সরবরাহও বেড়েছে। তবে কিছুটা সংকট আছে।

প্রতিবেদন তৈরি করেছেন বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার ও জেলা প্রতিনিধিরা।