জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে তীব্র বিতর্ক, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস
জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলের আনা একটি নোটিশের ওপর বুধবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সময় বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রস্তাব সরকার বিবেচনায় নেবে। তিনি উল্লেখ করেন, যদি তাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে।
বিরোধী দলের 'কমন কমিটি' প্রস্তাব
আলোচনার শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি 'কমন কমিটি' গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, 'এই জায়গায় আমরা সবাই ওপেন হার্ট নিয়ে বসতে পারলে, কথা বলতে পারলে কমন প্ল্যাটফর্ম থেকে অ্যাড্রেস করতে পারলে মানুষ একটা আস্থার জায়গা পেত।' শফিকুর রহমান আরও যোগ করেন, তাঁদের কিছু প্রস্তাব আছে, যা সরকার চাইলে তারা দেবেন। তবে 'কমন কমিটি' গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধীদলীয় নেতা ও বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম, অবশ্যই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।' তিনি উল্লেখ করেন, সংসদে মতপার্থক্য থাকলেও দেশ ও মানুষের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন যে আমরা বিরোধী দল সরকারি দল, সকলে মিলে কেন আলোচনা করতে পারি না? আমি সংসদকে অবহিত করতে চাই, সংসদ নেতা হিসেবে যে অবশ্যই আমরা বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাব আমাদের অবস্থান থেকে।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'যদি বিরোধী দলের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু থাকে তাহলে সরকার অবশ্যই তা করবে।' প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, বিএনপি সব সময় আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে কোনো কাজ করতে তারা ইচ্ছুক।
বিরোধী দলের অভিযোগ ও উদ্বেগ
বিরোধী দলের একাধিক সদস্য অভিযোগ করেন, জ্বালানিসংকট বৈশ্বিক হলেও এ ক্ষেত্রে সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপ যথাযথ ছিল না। শুরুতে জ্বালানি নিয়ে সঠিক তথ্যও সরকার তুলে ধরেনি। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ বলেন, মূল্যবৃদ্ধির পরও পাম্পের লাইন সংকুচিত হয়নি এবং কৃষক, শ্রমিকদের আয় বাড়েনি। এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ মন্তব্য করেন, 'এই সংকট মোকাবিলায় আমরা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ফেল করেছি।'
সরকারি দলের জবাব ও অবস্থান
সরকারি দলের পক্ষ থেকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আসলেই এটা সংকট নয়, এটা কৃত্রিম সংকট। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান যুদ্ধের আগে পাম্পগুলোতে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হতো, যুদ্ধ শুরুর পর তার চেয়ে বেশি দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, 'সংকট যেটা বলা হচ্ছে, আমরা যত তেল দেওয়ার দরকার, তা–ই দিয়ে যাচ্ছি।' তিনি পাম্পের সামনের লাইনকে 'অবৈধ লাইন' আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, দেশের অর্থনীতি যতটা বহন করতে পারে, সেই সীমার মধ্যে থেকে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি সত্যিই দেশব্যাপী জ্বালানিসংকট তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে কি চাষাবাদ, শিল্পকারখানা বা স্কুল-কলেজের কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে? বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকার সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আসছে।
সংসদে উত্তেজনা ও অন্যান্য ঘটনা
আলোচনার আগে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বক্তব্য ঘিরে সংসদে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা তৈরি হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারকে নাজেহাল করতে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে-বাইরে চক্রান্ত শুরু করেছে। বিরোধী দলের সদস্যরা তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, পরীক্ষা করে যদি অসংসদীয় কোনো ভাষা পাওয়া যায়, তা এক্সপাঞ্জ করা হবে।
সর্বোপরি, এই আলোচনা জ্বালানি সংকট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও সম্ভাব্য সমাধানের পথ দেখিয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উঠে এসেছে।



