রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: স্থানীয়দের মনোভাব ও চ্যালেঞ্জ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূল উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের মনে বিদ্যমান অজানা ভীতি ও সংশয় দূর করা। বর্তমান প্রজন্মের পারমাণবিক চুল্লিগুলো চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো পুরনো চুল্লির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ বলে দাবি করা হলেও, প্রকল্প এলাকার বাসিন্দাদের মতামত জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুবিধা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি উভয়ই তাঁরা সরাসরি অনুভব করবেন।
জরিপের ফলাফল: মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
একটি গবেষণা দল রূপপুর কেন্দ্রের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ৬০০ মানুষের ওপর জরিপ পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এই এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক। জরিপে পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা, নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার আশঙ্কা, পরিবেশগত প্রভাব, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, তথ্যপ্রবাহ ও কর্মসংস্থানসহ ২৮টি প্রশ্ন করা হয়। পরবর্তীতে ১৫ জনের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় সবাই জানান, রূপপুর নিয়ে এ ধরনের জরিপে অংশগ্রহণই ছিল তাঁদের প্রথম অভিজ্ঞতা। তাঁরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন এবং আরও তথ্য প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকে বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে এলাকায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জমির দাম ও বাড়িভাড়া বেড়েছে এবং ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে।
উদ্বেগের মূল কারণ: তথ্যের অভাব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা চান না তাঁদের এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হোক, কারণ তাঁরা নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অল্পসংখ্যক মানুষ মনে করেন, দেশের চরাঞ্চল বা জনবসতি কম এমন অঞ্চলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা উচিত। প্রায় সবাই স্বীকার করেছেন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে তাঁদের পরিষ্কার ধারণা নেই। পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।
কেউ কেউ মনে করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদ্মা নদীতে ফেলা হবে। আবার কেউ বলেছেন, প্রকল্পে চাকরি পেতে অনিয়ম, ঘুষ ও তথ্য গোপনের ঘটনা রয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং পরমাণু নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ওপর তাঁদের আস্থা খুবই কম বলে জানা গেছে।
পরিবেশগত প্রভাব ও আর্থসামাজিক বৈষম্য
পরিবেশগত দিক থেকেও নানা উদ্বেগ উঠে এসেছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, ভারী নির্মাণকাজের কারণে এলাকায় ইতিমধ্যে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমেছে এবং পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। পদ্মা নদীর পূর্ব পাশে ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও অন্যান্য এলাকায় চর সৃষ্টি ও ভাঙন বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, ডাব ও লিচুর ফলনও কমে গেছে।
আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুফল মূলত রূপপুরের পূর্ব পাশ তথা ঈশ্বরদী অঞ্চলে বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এলাকায়, যা কেন্দ্রের খুব কাছেই অবস্থিত, সেই তুলনায় উন্নয়ন কম হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ। তাঁদের মতে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অনুকূল বায়ুপ্রবাহের কারণে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সুপারিশ: সচেতনতা বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়ন
জরিপ ও সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারীরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ কীভাবে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখবে, সে বিষয়ে ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিলবোর্ড ও নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে বিকিরণে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য কাছাকাছি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। কারণ, আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য পাবনা বা কুষ্টিয়ার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে বিশেষায়িত স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করলেও দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জরুরি অবস্থা মোকাবিলা বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দিতে একটি সহজ গাইডলাইন তৈরি করে পাবনা, কুষ্টিয়া ও নাটোরের জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে স্কুল–কলেজে সহপাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে।
তথ্যকেন্দ্রের অপ্রতুলতা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
দুঃখজনক হলেও সত্য, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই ঈশ্বরদীতে অবস্থিত পারমাণবিক তথ্যকেন্দ্র সম্পর্কে জানেন না। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের মত হলো তথ্যকেন্দ্রটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি গ্রিন সিটির আশপাশে স্থানান্তর করা উচিত, যেখানে সাধারণ মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার থাকবে। একই সঙ্গে ঈশ্বরদীর মতো কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও মিরপুর এলাকাতেও সমানভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।
বর্তমানে ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। বাংলাদেশ এখন জ্বালানিসংকটে ভুগছে। এই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা যেমন জরুরি, তেমনি এর আশপাশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে তাঁদের দেওয়া সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের বাসিন্দাদের যথাযথভাবে সচেতন ও শিক্ষিত করে তুলতে পারলে তাঁরা কেন্দ্র পরিচালনা, নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণে সহায়ক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।



