বিদ্যুৎ সরবরাহে ঝুঁকি: আদানির বকেয়া বিলের তাগিদে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট
সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার মৌসুমে জ্বালানির অভাবে প্রয়োজনমতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না, যার ফলে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ভারতীয় কোম্পানি আদানি বাংলাদেশ সরকারকে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দ্রুত পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে।
বকেয়া বিল না শোধে বিদ্যুৎ সরবরাহে হুমকি
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বরাবর ১৭ এপ্রিল তারিখে পাঠানো চিঠিতে আদানি সতর্ক করে জানিয়েছে, বকেয়া বিল পরিশোধে দেরির কারণে প্রকল্পের অর্থপ্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানি কিনে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে আংশিক বা পুরোপুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকি থেকে যায়।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, চিঠিটি ১৯ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। তবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি এখনো চিঠিটি হাতে পাননি এবং চিঠি পাওয়ার পর করণীয় ঠিক করবেন।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও চুক্তির বিবরণ
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার, যেখানে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। ২০১৭ সালে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই চুক্তি অনুসারে আদানির কেন্দ্র থেকে ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ।
পিডিবি সূত্র বলছে, বর্তমানে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির কেন্দ্রটি। এর সরবরাহ বন্ধ হলে চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি তৈরি হবে, যা বিদ্যুৎ সংকটকে আরও তীব্র করবে।
বকেয়া বিল ও বিরোধের পটভূমি
আদানির পাঠানো সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়, কোম্পানির মোট পাওনা ৬৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার (প্রতি ডলারে ১২২ টাকা দরে ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা) নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, যা ৪ থেকে ৫ মাসের বিলের সমান। চিঠিতে দ্রুত পুরো বকেয়া শোধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিয়মিত বিল দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি পিডিবির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল আদানি, যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার দাম নিয়ে পিডিবির সঙ্গে আদানির বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। আদানি কয়লার বাড়তি দাম ধরে বিল করছে, অন্যদিকে পিডিবি বাজারদরে বিল পরিশোধ করছে।
আদালতের মামলা ও দুর্নীতির অভিযোগ
আদানির চুক্তির বিরুদ্ধে দেশের উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা চলমান। আদালতের চূড়ান্ত আদেশের পর করণীয় নির্ধারণ করবে পিডিবি। রিট আবেদনের পর আদালতের আদেশে আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেয় বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানির সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও চুক্তির প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়োগ করা আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা বর্তমানে কাজ করছেন।
বকেয়া বিলের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
পিডিবি ও আদানি সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বকেয়া প্রায় ৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আদানির দিক থেকে কয়েক দফা তাগাদা দিলে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিয়মিতভাবে বিল পরিশোধ করেছে পিডিবি এবং কিছু পুরোনো বকেয়াও শোধ করা হয়।
এতে মোট বকেয়া কমতে থাকে, কিন্তু গত ডিসেম্বর থেকে আবার বিল পরিশোধ কমিয়ে দেয় পিডিবি, যার ফলে বকেয়া আবার বাড়তে শুরু করে। চিঠিতে আদানি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেয় বলে উল্লেখ করে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে মন্ত্রীর সুবিধামতো সময়ে সাক্ষাতের অনুরোধ জানানো হয়েছে।



