ভোলায় নদীভাঙন ও ব্লক নির্মাণে সর্বস্ব হারিয়েছেন জামেলা খাতুন
ভোলায় নদীভাঙন ও ব্লক নির্মাণে সর্বস্ব হারিয়েছেন জামেলা

ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের জোড়খাল এলাকায় ইলিশা নদীর তীরে গাছপালায় ঘেরা একটি বিচ্ছিন্ন বাড়ি। গাছপালার আড়াল পেরিয়ে ভেতরে গেলে দেখা যায় পলিথিনে মোড়া ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। এতটাই নিচু যে কুঁজো হয়ে ঢুকতে হয়। স্যাঁতসেঁতে সেই ঘরেই বসবাস করছেন ৭০ বছর বয়সী জামেলা খাতুন ও তাঁর ৩৫ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী মেয়ে তাছনুর বেগমের। একসময় ফলদ ও বনজ গাছে ঘেরা যে ভিটা ছিল তাঁদের শেষ আশ্রয়, এখন সেটিই ভাঙন, দখল আর অবরুদ্ধ জীবনের প্রতীক।

জামেলা খাতুনের সংগ্রামী জীবন

জামেলা খাতুনের স্বামী আবদুল গনি জীবনের শেষ সঞ্চয় দিয়ে বাড়িটি গড়ে তুলেছিলেন। চারপাশে লাগিয়েছিলেন নানা ফলদ ও বনজ গাছ। জামেলার ভাষায়, ‘মানুষটা ১৮-১৯ বছর আগে দুনিয়া ছেড়ে গেছে। তার পর থেইকা এই ভরা সংসারের হাল আমি একলাই ধরছি।’

জামেলার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে আলাদা থাকেন, মেজ ছেলে ঢাকায়। ছোট ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন; তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের সংসারও কষ্টে চলে। প্রতিবন্ধী মেয়ে তাছনুর বেগমের বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু ১৮-১৯ বছর ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ নেই। জামেলা বলেন, ‘নদী যেমন আমার বাড়িঘর ভাঙছে, মেয়েটার কপালও তেমন ভাঙছে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নদীভাঙনের শিকার একাধিকবার

জামেলার জীবনে নদীভাঙন নতুন নয়। বাবার বাড়ি ছিল সদর উপজেলার ইলিশায়, শ্বশুরবাড়ি দৌলতখানের মধুপুরে। দুই বাড়িই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কয়েক দফা ভাঙনের পর তাঁর বাবা রাজাপুরে মোট আট গন্ডা জমি কিনেছিলেন। সেটিই ছিল পরিবারের শেষ সম্বল। কিন্তু মেঘনার ভাঙনে সেই জমিও এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। ভাঙনের পর ঠিক কতটুকু জমি অবশিষ্ট আছে, সেটিও জানেন না তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্লক নির্মাণে বাড়তি দুর্ভোগ

জামেলার অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্লক ফেলার কাজ শুরু হওয়ার পর তাঁর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ঠিকাদারেরা তাঁর আট গন্ডা জমির বড় অংশে ব্লক তৈরি ও সংরক্ষণ করেছেন। এতে কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য ফলদ ও বনজ গাছ, বালু ফেলার কারণে আরও অনেক গাছ নষ্ট হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার চারপাশের শত শত গাছ শেষ কইরা দিছে। কাটা গাছের বড় বড় কাঠের গুঁড়িগুলানও ওরা লইয়া গেছে। আমারে ফালাইয়া গেছে পচা ডালপালা।’

ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বেদনা

এত ক্ষতির বিপরীতে জামেলা একবার মাত্র এক হাজার টাকা পেয়েছেন বলে দাবি করেন। এরপর আর কোনো ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা মেলেনি। তাঁর ভাষায়, ‘তিনটা ঈদ চলে গেল, আমার এই পাগল মেয়ের দিকে চাইয়া কেউ ১০টা টাকাও দিল না।’

বর্তমানে জামেলা খাতুনের ঘরের চারপাশ ব্লকে ঘেরা। চলাচলের পথও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ১৮ বছর আগের চারচালা ঘরটি এখন একচালায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। তাই পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়েছে। তবু ভিটা ছাড়তে রাজি নন তিনি। কারণ, অন্যের জায়গায় গিয়ে ‘লাত্থি-উষ্টা’ খেয়ে বাঁচতে হবে—এই অপমান তিনি আর চান না।

সরকারি ভাতায় সংসার চলে না

সরকারি বয়স্ক ভাতা হিসেবে তিন মাস পরপর ১ হাজার ৮০০ টাকা পান জামেলা। তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে পান প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা ভাতা। এই সামান্য অর্থে সংসার চলে না। আগে বাড়ির ফল বিক্রি করে কিছু আয় হতো। এখন ব্লকে ঘেরা বাড়ির ফল অন্যরা পেড়ে নিয়ে যায়, সেই আয়ও বন্ধ।

স্থানীয়দের দাবি ও পাউবোর প্রতিক্রিয়া

জামেলা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নদীভাঙন তাঁদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, আর যা অবশিষ্ট ছিল, তা নষ্ট হয়েছে ব্লক নির্মাণের কারণে। নদীর পাড়ের ভাঙা ঘরে প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে বসবাস করা জামেলা এখন একটাই প্রশ্ন করেন, ‘গরিব মানুষের কান্না দেখার, শোনার ও বোঝার কি কেউ নেই?’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।