ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষে আনু মুহাম্মদের অভিযোগ: ইউনূসের চুক্তিতে কৃষক শৃঙ্খলিত
ইলা মিত্র জন্মশতবর্ষে আনু মুহাম্মদের অভিযোগ: ইউনূসের চুক্তি

ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষে আনু মুহাম্মদের অভিযোগ: ইউনূসের চুক্তিতে কৃষক শৃঙ্খলিত

অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেছেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত কৃষি খাতের চুক্তি করপোরেট পুঁজির হাতে কৃষকদের আরও বেশি শৃঙ্খলিত করেছে। তিনি বলেছেন, একটি অধীনতামূলক চুক্তি করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন

জাতীয় জাদুঘরে জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বক্তব্য

আজ সোমবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অবিভক্ত বাংলায় তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ এ অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘তেভাগা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত ছিল সামন্তব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এখন আগের সেই সামন্ত কৃষিব্যবস্থা নেই, করপোরেট পুঁজির আগ্রাসনের মধ্যে ঢুকে গেছে কৃষি। কৃষক এখন পুঁজির শৃঙ্খলে বন্দী।’

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট পুঁজির আগ্রাসন আমরা দেখে আসছিলাম। সর্বশেষ ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের কৃষিকে আরও শৃঙ্খলিত করার ব্যবস্থা করেছে। সে চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও করপোরেট স্বার্থের বাইরে বাংলাদেশ যেতে পারবে না—এমন একটি অধীনতামূলক চুক্তি করে ড. ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন।’

ইলা মিত্রের সংগ্রাম ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ইলা মিত্র দূর থেকে দেখার বিষয় নয়, তাঁর সংগ্রামকে নিত্যদিনের সংগ্রামের সাথি করে নিতে হবে। তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘ইলা মিত্র ভালো ছাত্রী ছিলেন, রাজনীতিতে প্রশিক্ষিত ছিলেন, খেলাধুলাতেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি বিধানসভার সদস্য, কলেজে পড়াতেন, বাজার করে রান্না করতেন, পার্টি অফিসে যেতেন—ঝড়ের গতিতে ছুটেছেন তিনি।’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ইতিহাসের বিকৃতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের কোন টেক্সট বইয়ে ইলা মিত্রর নাম বা তেভাগা আন্দোলনের কথা নেই। সবচেয়ে বড় বিকৃতি সত্যকে আড়াল করে রাখা। জমি বর্গা দেওয়া যায়, কিন্তু স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। মেহনতি মানুষকে নিজেদের স্বার্থে দাঁড়াতে হবে।’

তেভাগা আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব

গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ বলেন, ‘এমন একজনকে নিয়ে কথা বলতে এসেছি, যাঁকে আমাদের রাষ্ট্র কখনো গুরুত্ব দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা অন্য দেশের জিম্মায় দিয়েছে। নানকার বিদ্রোহ থেকে গণ–অভ্যুত্থান—সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে কৃষক ও তাদের সন্তানেরা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনো কৃষকের পক্ষে দাঁড়ায়নি।’

কবি ও লেখক সোহরাব হাসান বলেন, ইলা মিত্র শুধু তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন না, তিনি শিক্ষাব্রতী, বিধানসভার সদস্য ও কমিউনিস্ট নেত্রী ছিলেন। কলকাতার জীবন ছেড়ে পার্টির সিদ্ধান্তে নাচোলে চলে আসেন, কৃষকদের কাছে তিনি ‘রানি মা’ ছিলেন। সোহরাব হাসান আক্ষেপ করে বলেন, ‘পূর্ব বাংলায় ইলা মিত্র থাকতে পারেননি, কিন্তু পূর্ববঙ্গকে কখনো ভুলতে পারেননি। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের উচিত ছিল তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া। ব্রিটিশ আমলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র উদ্যোগ নিতে পারত তিনি নির্দোষ ছিলেন। তাঁকে কি একটা সম্মানজনক নাগরিকত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না?’

অনুষ্ঠানের অন্যান্য দিক

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা ইলা মিত্রর জীবন ও কর্মের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘সংগ্রামের শুরু সাঁওতাল বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে আরও দুই বছর আগে।’ অনুষ্ঠানের শুরুতে ইলা মিত্রর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এএলআরডির চেয়ারপারসন খুশী কবির সঞ্চালনায় বলেন, ‘হবু প্রধান বিরোধী দল বলছে নারী কিছু করতে পারে না। তারা ইলা মিত্রর জীবন ও কর্ম দেখে জানতে পারে নারী কী করতে পারে।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের খোকন সুইটেন মুর্মু বক্তব্য দেন। ইলা মিত্র জীবন ও কর্ম নিয়ে সংকলিত বই ‘বঞ্চনা ও বৈষম্যবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী–ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন গড়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলায়, যেখানে ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ ভূমিহীন কৃষকের ও এক ভাগ জমির মালিকের দাবি ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে কলকাতা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে আসেন ইলা মিত্র, কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন জোরদার করেন।