ক্যাশলেস লেনদেনের স্বার্থে এমডিআর শূন্যের দাবি
বাংলা কিউআর ও এমডিআর (মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তিসংক্রান্ত গ্রুপগুলোতে কিছুদিন ধরে তুমুল আলোচনা চলছে। অন্যদিকে নগদ টাকাবিহীন বা ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নানা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সেমিনারে বক্তারা এ ধরনের লেনদেন উৎসাহিত করতে মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করেছেন; কিন্তু প্রণোদনার বদলে মার্চেন্টদের ওপর বিক্রীত মূল্যের শতকরা ১ ভাগ (সর্বনিম্ন) মাশুল আরোপের সিদ্ধান্ত হয়। এটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচনার বিষয়। এসব আলোচনার মূল বক্তব্য হলো—তাহলে নগদ টাকাবিহীন লেনদেন কীভাবে উৎসাহিত হবে?
কিউআর কোড লেনদেনের প্রক্রিয়া
এ বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার আগে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। কিউআর কোড লেনদেনে যুক্ত পক্ষ তিনটি। তারা হলো ১. মার্চেন্ট বা দোকানদার, ২. গ্রাহক এবং ৩. ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি। রকেট, বিকাশ, নগদ, উপায় ইত্যাদি হলো এমএফএস বা মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া এসএসএল কমার্জ, সূর্যপে, পে স্টেশন ইত্যাদি হলো পিএসপি বা লেনদেন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি মার্চেন্টকে বাংলা কিউআর প্রদান করে থাকে। এতে তাদের এককালীন খরচ পড়ে ৯০ থেকে ১০০ টাকা। যেসব ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি মার্চেন্টকে বাংলা কিউআর প্রদান করে, তাদের অ্যাকুয়ারার বলে। বিনিময়ে প্রতিটি লেনদেনে তারা মার্চেন্টের কাছ থেকে যে ফি নেয়, সেটিকে এমডিআর বলে।
এমডিআর শূন্য করার যুক্তি
নগদ টাকাবিহীন লেনদেনব্যবস্থা বাস্তবায়নের স্বার্থে এমডিআর জিরো করে দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ব্যাংক-এমএফএস-পিএসপির মধ্যে অর্থ স্থানান্তর ফ্রি করে দেওয়া দরকার।
আবার ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি গ্রাহক অনবোর্ড করে থাকে এবং ওইসব গ্রাহক যেন মার্চেন্টের কাছ থেকে কোনো কিছু ক্রয়ের পর তার দাম দোকানদারের বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে লেনদেন করতে পারে, তার জন্য মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে তা প্লে স্টোর বা গুগল-প্লের মাধ্যমে গ্রাহকের মুঠোফোনে পৌঁছে দেয়। যেসব ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি এ কাজটি করে, তাদের ইস্যুয়ার বলে। একই ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি একই সঙ্গে অ্যাকুয়ারার ও ইস্যুয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে।
এখন ধরা যাক, ‘ব্যাংক–এ’ একটি দোকানে বাংলা কিউআর প্রদান করেছে। ওই দোকানে ‘ব্যাংক– বি’–এর একজন গ্রাহক এক হাজার টাকার কেনাকাটা করে ব্যাংক বি–এর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কিউআরে লেনেদেন করেছে। অথবা গ্রাহকের এমএফএস হিসাব থেকে লেনদেন সংঘটিত হয়েছে। বর্তমান নিয়মে ব্যাংক-এ ১০ টাকা (১ শতাংশ) এমডিআর হিসাবে কেটে বাকি ৯৯০ টাকা দোকানদারকে দেবে। তারপর ব্যাংক-এ, ব্যাংক-বি–এর কাছ থেকে ৯৯৩ টাকা গ্রহণ করবে (বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আলোচ্য ক্ষেত্রে আইআরএফ হল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ)। আইআরএফ হলো এমন একটি ফি, যা অ্যাকুয়ারিং ব্যাংক ইস্যুয়িং ব্যাংকে প্রদান করে থাকে।
অন্যদিকে ব্যাংক-এ গ্রাহকের হিসাব থেকে এক হাজার টাকা কেটে নেবে। ফলে ব্যাংক-এ লাভ হবে ৩ টাকা, ব্যাংক-বি–এর লাভ হবে ৭ টাকা; আর দোকানদারের খরচ হবে ১০ টাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, পৃথিবীর বহু দেশে এমডিআর শূন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আইআরএফও জিরো হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালে নগদ টাকাবিহীন লেনদেন উৎসাহিত করার জন্য এমডিআর শূন্য করা হয়েছে।
নেপালের অভিজ্ঞতা
আমি সম্প্রতি নেপালের বৃহত্তম এমএফএস ইসেওয়া পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইস্যুয়ার হিসাবে বা অ্যাকুয়ারার হিসাবে তাদের বা ব্যাংকের লাভ কী? জবাবে তিনি জানান, ইস্যুয়ার গ্রাহকদের এবং অ্যাকুয়ারার মার্চেন্টদের লো-কোস্ট বা নো-কস্ট ডিপোজিট পায়। এটিই তাদের লাভ। ইসেওয়ার কিউআর ব্যবহার করে ভারতের ইউপিআই এবং চায়নার আলিপের গ্রাহকেরা নেপালে এসে লেনদেন করলে তারা ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ এমডিআর পায়। এ ছাড়া উইচেট পে, ভিসা, মাস্টারকার্ড এবং ইউনিয়ন পের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশনের কাজও করছে তারা। নেপালে কিউআর কোড নেটওয়ার্ক দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করে না; বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পিএসও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, যেমন ফোনপে পরিচালনা করে থাকে। ফলে ফোনপে আরও আয়বর্ধক নানা সেবা গ্রাহকদের দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের এমএফএস কোম্পানিগুলোর আপত্তি
বাংলাদেশের এমএফএস কোম্পানিগুলোর এমডিআর শূন্য করলে কী হবে? তারা বলবে, তাদের ক্যাশ-ইনে খরচ আছে। এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর ও টেলিকম কোম্পানিকে প্রতি লেনদেনে ফি দিতে হয়। কিউআর কোডের মাধ্যমে জিরো এমডিআরে পেমেন্ট হলে তাদের লোকসান হবে। আমরা কি এই চক্র থেকে বের হতে পারব না? এমএফএস চালুর ১৫ বছর পরও কেন এই এজেন্টনির্ভরতা? নেপাল ও ভারত যদি এজেন্টনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে, আমরা কেন পারব না? বর্তমানে নেপাল ও ভারতের এমএফএসগুলোর ৯০ ভাগ ক্যাশ-ইন হয় ব্যাংক থেকে টাকা স্থানান্তর করে। নেপাল ও ভারতে এ ধরনের অর্থ স্থানান্তর হয় সম্পূর্ণ বিনা খরচে। অথচ বাংলাদেশে এ ধরনের লেনদেনের জন্যও গ্রাহকদের ফি দিতে হয়। উল্লেখ্য, নেপাল ও ভারতের ব্যাংকগুলোর গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছানোর হার ও গ্রাহকদের আর্থসামাজিক অবস্থা মোটামুটি বাংলাদেশের সমতুল্য।
ইন্টারঅপারেবিলিটি চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে আমরা এমএফএস-ব্যাংক ইন্টার অপারেটিবিলিটি চালু করতেই হিমশিম খাচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে আগামী আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান মার্কেটের সিংহভাগ শেয়ার নিয়ে নিলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভালো কিছু করতে গেলেই নানা বাধার মুখে পড়ে। তাই হয়তো গ্রামীণফোনকে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি) আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ব্যাংকিং ডোমেইনেও এ রকম পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা বিবেচনার বিষয়।
উপসংহার: এমডিআর শূন্য ও ফ্রি ট্রান্সফারের প্রস্তাব
ডিম আগে, নাকি মুরগি আগে—এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে, আমার মতে, এখনই নগদ টাকাবিহীন লেনদেনব্যবস্থা বাস্তবায়নের স্বার্থে এমডিআর জিরো করে দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ব্যাংক-এমএফএস-পিএসপির মধ্যে অর্থ স্থানান্তর ফ্রি করে দেওয়া দরকার। তা না হলে বাংলাদেশে নগদ টাকাবিহীন লেনদেনের স্বপ্ন শুধু আকাশকুসুম কল্পনা থেকে যাবে।
ওপরের পদক্ষেপগুলো নির্ধারণ করবে ক্যাশইনের জন্য এমএফএসগুলো কোন মাধ্যমকে প্রমোট করবে—এজেন্ট নেটওয়ার্ক নাকি ব্যাংক স্থানান্তর। এমনটি হওয়া উচিত হবে না যে এমএফএস কোন মাধ্যমে ক্যাশইন করে, সেটি মাথায় রেখে এমডিআর নির্ধারণ করা।
আবুল কাশেম মো. শিরিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক



