নাজিরপুরে সরকারি ধান ক্রয়ে বড় অনিয়ম
পিরোজপুরের নাজিরপুরে সরকারের ধান ক্রয় কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতারা কৃষকের পরিবর্তে নিজেরা ধান বিক্রি করেছেন এবং ঘুষ দাবি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে কৃষকের হাজার মণ ধান গোডাউনের সামনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে।
ঘুষ দাবি ও গুদাম কর্মকর্তা বদলি
অভিযোগ রয়েছে, ধান বিক্রির জন্য গুদামরক্ষক কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) প্রতিটি কার্ডের জন্য ৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। কৃষকরা টাকা দিতে না পারায় তাদের ধান গ্রহণ করা হয়নি। উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদুর রহমান জানান, ঘুষ গ্রহণ ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় ওই কর্মকর্তার বদলি আদেশ হয়েছে। এ পর্যন্ত ধান ক্রয় কর্মসূচির অর্ধেক ক্রয় করা হলেও তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের তালিকা
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হাসান খানের হাতের লেখা ধান বরাদ্দের একটি তালিকা যুগান্তরের কাছে পৌঁছেছে। তালিকায় দেখা গেছে, উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ ৬ নেতার প্রত্যেকে ৮টি করে কার্ড নিয়েছেন। এছাড়া যুব ও ছাত্রদলসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নামও রয়েছে। প্রতিটি কার্ডে ৩ টন করে ধান বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগ, এসব নেতা কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত নন এবং তাদের নামে কোনো কৃষি কার্ড নেই।
কার্ড বিক্রি ও কৃষকের ভোগান্তি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, অধিকাংশ নেতার নামে বরাদ্দকৃত কার্ড ১০ হাজার টাকায় স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তারা কৌশলে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে কৃষি কার্ড সংগ্রহ করেছেন। কোনো কোনো কৃষককে ১ হাজার টাকা দিয়ে আবার কাউকে হুমকি দিয়ে কার্ড নিয়ে আসা হয়েছে।
উপজেলা সদরের কৃষক জাকির হোসেন খান অভিযোগ করে বলেন, তিনি নিজ নামের একটি কৃষি কার্ডে ৩ টন ধান বিক্রির জন্য গোডাউনে যান। গুদাম কর্মকর্তা ওই ধান ঢুকাতে তার কাছে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তার ধান ফেরত দেওয়া হয়।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীঘিরজান গ্রামের কৃষক তুজম্বর ভূঁইয়া বলেন, গোডাউন কর্মকর্তাকে চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তাদের ধান এখনো বস্তায় করে রাস্তার উপরে স্তূপ করে রাখা রয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং অঙ্কুরোদগমের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান দুলাল বলেন, তিনি ধানের কোনো কার্ড বণ্টনের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন। তিনি শুনেছেন, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিবসহ অন্যরা এ বণ্টনের তালিকা করেছেন। তবে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হাসান খান কোনো বণ্টনের ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, প্রকৃত কৃষকরাই ধান দিয়েছেন।
গুদাম কর্মকর্তার অস্বীকৃতি
গুদামরক্ষক কর্মকর্তা মহিমা আক্তার ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গুদামে ধান বিক্রি করতে আসা কোনো প্রকৃত কৃষকের কাছে ঘুষ দাবি করা হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র
সরেজমিন উপজেলার শ্রীরামকাঠী খাদ্যগুদামে গিয়ে দেখা গেছে, গুদামের পেছনের রাস্তার দুপাশে এবং গোডাউনের সামনের খালপাড়ে বস্তায় করে স্তূপ করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার মণ ধান। পলিথিনে ঢেকে রাখা হলেও নিচ থেকে বৃষ্টির পানিতে ভিজছে। চলতি বোরো মৌসুমে ধানের দাম কম থাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নাজিরপুরে ১ হাজার ৩০৬ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। প্রতি মণ ধানের বাজার মূল্য ৮-৯শ টাকা হলেও সরকার ১ হাজার ৪৪০ টাকায় ক্রয় করছেন। সেই সুযোগে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে তালিকা করে কৃষকের পরিবর্তে নিজেরাই ধান দিয়েছেন।



