নতুন সরকারের আগমনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান
দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পার করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বস্তি ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থানও বাড়েনি, এবং দেশ অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা সহজ কাজ নয়, কিন্তু নতুন সরকারের আগমনে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর চাঁদাবাজি দমন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের প্রত্যাশা
নতুন সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে দমনের কথা বলেছেন, যা একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আশা করা যায়, নতুন সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে এমন আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাত: বাণিজ্য, অর্থ, বিদ্যুৎ ও নৌপরিবহন
বেসরকারি খাতের উন্নয়নে চারটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই খাতগুলো হলো বাণিজ্য, অর্থ ও পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং নৌপরিবহন। প্রতিটি খাতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হাতে রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়: প্রথমত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অসম বা অকার্যকর চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তাই সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্ব ব্যবসায়ীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়: এই মন্ত্রণালয়ের সামনে অনেক কাজ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদহার। বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ, অথচ বিশ্বে এটি ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুদহার এক অঙ্কে না নামলে নতুন বিনিয়োগ হবে না, এবং বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থানও বাড়বে না। একই সঙ্গে, পণ্য খালাস দ্রুত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা চালু রেখে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় এক দিনে শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করা গেলে ব্যবসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: এই খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো দরকার। তেল পরিশোধনাগার শুধু সরকারি খাতে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি, এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে; আরও দুটি স্থাপনের উদ্যোগ এখনই নিতে হবে, কারণ পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত অন্তত দুই বছর সময় লাগে।
নৌপরিবহন খাত: এই খাতও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগে বন্দর সম্প্রসারণ এগিয়ে নিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বন্দর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নদীবন্দর উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতে নতুন ঘাট নির্মাণের সুযোগ দেওয়া গেলে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং বাণিজ্যে গতি আসবে।
ব্যক্তি খাতের উন্নয়নে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত ব্যক্তি খাতনির্ভর। ব্যক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং উৎপাদনমুখী খাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে। বর্তমানে একটি কোম্পানিকে বছরে ২৬ থেকে ৩৮টি লাইসেন্স নিতে হয়, যেগুলোর অনেকগুলো নিয়মিত নবায়ন করতে হয়। একটি সমন্বিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে, যাতে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়।
দুটি অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
সবশেষে, দুটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, আমদানি করা কাঁচামালের শুল্কায়ন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা; দ্বিতীয়ত, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। নতুন সরকারের সামনে অনেক কাজ রয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ানো বা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে, যেসব প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছে সেগুলো খুব দ্রুত হবে না, তবে সরকার চাইলে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে। তাতে ধাপে ধাপে সুফল পাওয়া যাবে। সবশেষে বলা দরকার, আগে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থায় নেওয়া দরকার। দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করলে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে, এবং বেসরকারি খাত বিনিয়োগে এগিয়ে এলে অর্থনীতিও গতি পাবে।
