নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমের দায়িত্ব গ্রহণ
নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ

নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ: বিএনপির দুই নেতার উত্থান

দেশের নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রাক্তন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। এছাড়া, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম। এবারই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, যা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর: ব্যবসায়ী নেতা থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী

১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণকারী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৬ সাল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর বাবা খন্দকার আবদুল মালিক ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন, যা পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন।

যোগাযোগ করা হলে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, 'দল যে আস্থা দেখিয়েছে, তা যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করব। নিজের দায়িত্ব পালনে সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেব।' তাঁর মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, 'ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। দলের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও আনুগত্যের মূল্যায়ন তিনি পেয়েছেন। এ জন্য আমরা উচ্ছ্বসিত।'

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের এপ্রিলে সিলেট এম এ জি ওসমানী বিমানবন্দরের সামনে থেকে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরকে গ্রেপ্তার করেছিল সিলেট কোতোয়ালি থানার পুলিশ, যা তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত।

শরীফুল আলম: বহুমুখী প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব

নতুন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে পরিচিত। তিনি বাণিজ্যের পাশাপাশি শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করবেন, যা তাঁর বহুমুখী ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। এবারের নির্বাচনে তিনি কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন এবং ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

১৯৮০ ও ১৯৯০–এর দশকে বহুল প্রচারিত একটি টিভি বিজ্ঞাপন ছিল, 'আলমের ১ নং পচা সাবান'। এই সাবান কারখানাটি এখনো সক্রিয় রয়েছে, যা শরীফুল আলমের পারিবারিক ব্যবসার অংশ। পচা শু কোম্পানি নামেও তাঁদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং কক্সবাজারে 'লং বিচ' নামের বহুতলবিশিষ্ট একটি হোটেল আছে শরীফুল আলমদের মালিকানায়।

যোগাযোগ করলে নতুন প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে জানান, কাল বুধবার সকালে তিনি প্রথমে যাবেন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে। এরপর যাবেন চন্দ্রিমা উদ্যানে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমাধিতে। সেখান থেকে সচিবালয়ে যাবেন তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন শুরু করতে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ইতিহাস ও চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮১ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাণিজ্য বিভাগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগ নামে দুটি ভাগ করা হয়। পরের বছর ১৯৮২ সালে শিল্পের সঙ্গে একীভূত করে করা হয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তারও তিন বছর পর ১৯৮৫ সালে একক মন্ত্রণালয় হিসেবে পুনর্যাত্রা শুরু করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, যা এখন পর্যন্ত চলমান।

সরকারি কার্যপ্রণালিবিধিতে বাণিজ্য এবং বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ৩১ ধরনের কাজকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:

  • অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য চলমান রাখা এবং সম্প্রসারণে সহায়তা
  • আমদানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ
  • দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা
  • পণ্য ও সেবা রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ
  • বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ও রপ্তানির স্বার্থে দর–কষাকষি করা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪টি দপ্তর রয়েছে, যার মধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এবং বাংলাদেশ চা বোর্ড উল্লেখযোগ্য।

পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

নীতিগত, কাঠামোগত ও বৈশ্বিক ঝুঁকি মিলিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, মোটাদাগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জ এখন পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত:

  1. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা
  2. রপ্তানি বহুমুখীকরণসহ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা
  3. বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা
  4. স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা
  5. বাণিজ্য–সংক্রান্ত গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ জোরদার করা

নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর উপর এখন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের দায়িত্ব বর্তায়। তাঁদের নেতৃত্বে বাণিজ্য খাতের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে।