চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জ্বালানি, ১৪টি বোয়িং বিমান, গম, সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাধ্যতামূলকভাবে আমদানি করতে হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামে ও কম সময়ে পণ্য আমদানি থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চুক্তির শর্ত ও উদ্বেগ
চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্ত মূলত চীন ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করে আনা হয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, যার ফলে চুক্তি বাতিলের দাবি আবারও সামনে এসেছে।
কিছু রাজনৈতিক দল এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বলে অভিযোগ করছে এবং তারা এটি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাদের অভিযোগ, ‘অত্যন্ত গোপনীয়তার’ সঙ্গে চুক্তিটি করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের পরই কেবল তা জানা গেছে। তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টরা গোপনীয়তার অভিযোগ অস্বীকার করছে।
চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা
চুক্তি বিরোধীরা মনে করেন, সরকার চাইলে জাতীয় সংসদে আলোচনা-পর্যালোচনা করে চুক্তির ব্যাপারে অবস্থান নিতে পারে। এটি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। চুক্তিতে ৬০ দিনের একটি প্রবেশনারি সময়ের কথা বলা আছে, যার মধ্যে এটি বাতিল করা সম্ভব। গত বুধবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে চুক্তি বাতিলের দাবি জানান।
নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সংসদে আলোচনা করে চুক্তি ঘিরে বিতর্ক ও প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য সহজ হবে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, সরকারের কেউ কেউ মনে করেন চুক্তিটি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাদের একজন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তুলে ধরবেন।
খলিলুর রহমানের ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আলোচনা এবং স্বাক্ষরের পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন ড. খলিলুর রহমান, যিনি বর্তমান সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার পেছনে একটি বার্তা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচনের আগে প্রধান দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ওই চুক্তি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
সরকারের অবস্থান
বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্কের উন্নতি এবং ভূ-রাজনীতি বিবেচনায় সরকার চুক্তিটি বাতিল করবে না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ন্যাশনাল ইমারজেন্সি ঘোষণা করে দেশে দেশে বাড়তি শুল্ক আরোপ করছে, তখন সেই শুল্ক কমানোর জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থ দেখার প্রয়োজন ছিল।



