অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক-বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির সভাপতি দৌলত আকতার মালার নেতৃত্বে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রস্তাবনার গুরুত্ব
ইআরএফ বলেছে, বর্তমানে দেশ একটি অস্বাভাবিক ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী ও বিশেষধর্মী বাজেট প্রণয়ন জরুরি, যেখানে সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জিডিপি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা
সংগঠনটি মনে করে, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এলডিসি উত্তরণের আগে ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো না গেলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ
ইআরএফের মতে, শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপণ্যে ডিলার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত মুনাফা নির্ধারণ করে তা কার্যকর করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ওপেন মার্কেট সেলের মতো কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগে পুনর্বিন্যাস
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো বন্ধ করে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে পুঁজিবাজারে নতুন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের সুপারিশ
প্রতিটি বিভাগীয় শহরে উন্নত মানের হাসপাতাল স্থাপন, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ব্যক্তিগত চাপ (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
বৈষম্য ও ঝুঁকিভাতা নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর বিদ্যমান ঝুঁকিভাতা আর্থিক বৈষম্য তৈরি করছে উল্লেখ করে তা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার
বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান কমছে উল্লেখ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবন এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
সংস্কার পরিকল্পনায় স্বচ্ছতার দাবি
সরকার ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির ধরন ও সম্ভাব্য প্রভাব বাজেট বক্তব্যে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে ইআরএফ।
দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন
কারিগরি শিক্ষাকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা, পিপিপি ভিত্তিতে মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশি শ্রমিক নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এলডিসি পরবর্তী প্রস্তুতি
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রেডিক্টেবল রাজস্ব নীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসএমই ও জ্বালানি খাত
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তায় সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ট্রান্সফার প্রাইসিং আইন কার্যকর প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ বন্ধের কথাও বলা হয়েছে।
রাজস্ব কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব
কর নেট সম্প্রসারণ, প্যাকেজ ভ্যাট পুনর্বহাল, কর ছাড়ে স্বচ্ছতা এবং এনবিআরের ডাটাবেজের সঙ্গে ব্যাংক তথ্য সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি রোধে এই ডাটাবেজ ব্যবহারের বিধান চালু হলে তা অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘গেম-চেঞ্জার’ হতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।
জনস্বস্তির জন্য কর প্রস্তাব
নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ নির্ধারণ, ছোট সঞ্চয়ে আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার, লভ্যাংশ কর কমানো এবং কর ফেরত প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইআরএফের মতে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের করের চাপ কমবে এবং বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরে আসবে।



