রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও নারী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরাকে পেটানোর পর অপসারণের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহী শহরের সাহেববাজার এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত বিএনপি নেতারা এই দাবি জানান।
ঘটনার বিবরণ
এর আগে গত বৃহস্পতিবার অভিযুক্তরা অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাককে তার অফিসে পিটিয়ে আহত এবং অফিসে ভাঙচুর করেন। এর আগে তারা অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে নারী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরাকে জুতাপেটায় আহত করেন। শুক্রবার ওই ঘটনার একাধিক ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, জুতাপেটায় আহত প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা ও শাহাদ আলী নামের এক সাবেক যুবদল নেতাকে চড় মারেন এবং দু’জনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন গ্রাম্য মাতব্বর ও স্থানীয় বিএনপির নেতা আব্দুস সামাদ দারোগা। উপস্থিত ছিলেন ওই ঘটনায় বহিষ্কৃত ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীসহ ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইউজদার আলী ও সাবেক সভাপতি আফাজ উদ্দিন। সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত বিএনপি নেতারা দাবি করেন, ঘটনাটি গণমাধ্যমে আংশিক ও বিকৃতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
আব্দুস সামাদ বলেন, ‘আমাদের চাঁদাবাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কলেজে পূর্বের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জবাবদিহি চাইতে গেলে আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং প্রথমে তাদের ওপর হামলা চালান প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও প্রদর্শক আলেয়ার অপসারণ নিশ্চিত করা হোক এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
প্রদর্শকের বক্তব্য
এ বিষয়ে প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় কলেজে এসে তারা বিগত সময়ের হিসাব চাইতেন, যা মূলত চাঁদা দাবির অংশ ছিল। এবার তারা এসেছিলেন মাহফিলের নামে চাঁদা আদায় করতে। অধ্যক্ষের পাশে থেকে প্রতিবাদ করায় আমিও হামলার শিকার হয়েছি। আমি বিচার চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে অধ্যক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আপত্তিকর কথা বলা হয়। এ কারণে তিনি মেজাজ হারিয়ে বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীকে চড় মারেন। এরপর তাকে স্যান্ডেল খুলে এবং চুল টেনে ধরে বেধড়ক পেটান শাহাদ আলী।’
গত বৃহস্পতিবার দুপুরের ওই ঘটনায় অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। শুক্রবার দুপুরে তিনি ছুটি নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় বিশ্রামে রয়েছেন। তাকে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে। এর মধ্যে জুতাপেটার অংশের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কলেজে চাঁদা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে।
প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা বলেন, ‘আমি ঘটনার ভিডিও করছিলেন। এ জন্য কানে থাপ্পড় দিয়ে ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। প্রচণ্ড মারধরের কারণে আমার একটি দাঁত ভেঙে গেছে। আরও দুটি দাঁত নড়বড় করছে। পরিকল্পিতভাবে এই হামলা ও মারধোরের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।’
অধ্যক্ষের বক্তব্য
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক জানান, চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। তিনি এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। কলেজের শিক্ষকেরা জানান, কলেজের অনেক জায়গাজমির আয় ভালো। আগে এই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা মোজাম্মেল হক। তার কাছ থেকেও স্থানীয় একাধিক চক্র চাঁদা নিত। আওয়ামী সরকারের পতনের পরও মোজাম্মেল হক নিয়মিত চাঁদা দিয়ে কিছুদিন অধ্যক্ষ পদে টিকে ছিলেন। পরে তিনি অবসর গ্রহণ করলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হন এনামুল হক। তার কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হতো। তার পরের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ জন্য স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্র তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
ঘটনার পটভূমি
ভুক্তভোগী প্রদর্শক আলেয়া জানান, দু’দিন আগে স্থানীয় দুলাল নামের একজন ব্যক্তি তাকে বলেন, অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের আলোচনা আছে। তারা কলেজে আসবেন। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে এলাকার বিএনপি কর্মী আব্দুস সামাদের নেতৃত্বে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আফাজ উদ্দিন ও বিএনপির কর্মী শাহাদ আলীসহ ১০-১২ জন ব্যক্তি আসেন।
আলেয়া খাতুন তাদের একটি কক্ষে বসতে দিয়ে তিন-চারজনকে অধ্যক্ষের কক্ষে যেতে বলেন। এতে আলেয়ার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা সবাই মিলে গিয়ে অধ্যক্ষকে অশালীন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন মাহফিলের নামে। অধ্যক্ষ এই খাতে কলেজ থেকে টাকা দিতে পারবেন না জানালে তারা বলেন, ‘টাকা দিতে পারবি না তো চেয়ারে কেন?’ এ সময় আলেয়া খাতুন এর প্রতিবাদ করেন।
আলেয়ার দাবি, তিনি প্রতিবাদ করলে শাহাদ আলী তার সঙ্গে বাগবিতণ্ডা শুরু করেন। শাহাদ আগে তাদের বাড়িতে কামলা দিতেন। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে আলেয়া বলেন, ‘তুই কত বড় নেতা হয়েছিস?’ এ সময় শাহাদ তাকে বলেন, ‘তুই কেন বাধা দিচ্ছিস? তুই এখানে প্রিন্সিপালের সঙ্গে বাসর করিস।’ এ কথা শুনে রেগে গিয়ে তিনি শাহাদকে একটি থাপ্পড় দেন। এরপর শাহাদও পায়ের স্যান্ডেল খুলে তাকে ক্রমাগত পেটাতে থাকে।
শিক্ষকেরা জানান, জুতাপেটা করার পরও আলেয়াকে ধরে সবাই মিলে প্রচণ্ড মারধর করেন। শার্টের কলার ধরে অধ্যক্ষকেও শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়। মার খেয়েও মোবাইলে ভিডিও করছিলেন আলেয়া। পরে সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে মাঠে আসেন। রাগ সামলাতে না পেরে আলেয়া তখন কৃষকদল নেতা জয়নাল আবেদীন ও বিএনপি নেতা আফাজ উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই নারীকে নিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। ঘটনার পর আফাজ উদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে আত্মগোপন করেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য
প্রদর্শককে জুতাপেটায় অভিযুক্ত শাহাদ আলী বলেন, ‘আমি কলেজের একটা পুকুর লিজ নিয়ে চাষ করি। এর টাকা দেওয়ার জন্য কলেজে গিয়েছিলাম। কলেজ গরম দেখে চলে আসতে চেয়েছিলাম। তখন আলেয়া আমার সঙ্গে তর্কে জড়ায় এবং থাপ্পড় দেয়। মেয়ে মানুষের হাতে থাপ্পড় খেয়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে জুতা খুলে আমি কয়েকটা দিয়েছি।’
তবে শাহাদ আলী পরিকল্পনা করেই কলেজে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন প্রদর্শক আলেয়া। তিনি বলেন, ‘শাহাদ পুকুরের টাকা দেয় না। প্রভাব দেখালে টাকা আর কেউ চাইবে না, এ জন্যই সে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। সবাই পরিকল্পনা করেই একসঙ্গে কলেজে এসেছিল। এই ঘটনার জন্য একটু সুস্থ হলেই আমি মামলা করব। মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
পুলিশের বক্তব্য
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টির তদন্ত চলমান। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।



