রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর: শ্রমিক সংগঠনের ৭ দফা দাবি
রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর: ৭ দফা দাবি শ্রমিক সংগঠনের

রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ শুক্রবার সকালে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে অবস্থিত অস্থায়ী বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

শ্রমিকবান্ধব সরকারের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকেরা গাড়ি–বাড়ি করার জন্য কারখানায় কাজ করেন না। তাঁরা কোনোমতে পরিবার নিয়ে দিন পার করার লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রম করেন। শ্রমিকদের তৈরি করা পণ্য রপ্তানি করে গাড়ি–বাড়ি করেন কারখানার মালিকেরা। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। সেই শ্রমিকদের যথাসময়ে বেতন–বোনাস পেতে করতে হয় আন্দোলন। আন্দোলন করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে হয়। আমরা এখনো শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্র ও শ্রমিকবান্ধব সরকার পাওয়ার আশা নিয়ে অপেক্ষায় আছি।’

১৩ বছর পূর্তিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার ৯ তলা ভবন ধসে নিহত হন ১ হাজার ১৩৮ জন। আহত হন অনেকে। আজ শুক্রবার সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ডের অদূরে রানা প্লাজার সেই ঘটনাস্থলের সামনে জড়ো হন নিহতদের স্বজন, আহত শ্রমিক, জার্মানির শ্রমিক সংগঠন ভার্ডির একটি নারী প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন অধিকার ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মী ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা। তাঁরা ঘটনাস্থলের সামনে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৭ দফা দাবি

পরে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সমাবেশে সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন তাঁরা। দাবিগুলো হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • রানা প্লাজার পাঁচটি গার্মেন্টস ও তাজরীন ফ্যাশনসে নিহত ও আহত শ্রমিকদের পুনর্মূল্যায়ন করে ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা।
  • দেশের তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য সরকার, আইএলও এবং নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিমের আওতায় রানা প্লাজার ৫টি গার্মেন্টস ও তাজরীন ফ্যাশনসে নিহত, আহত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা।
  • শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করা।
  • রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনসের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তার নামে সরকার-বিজিএমইএ-বিভিন্ন এনজিও, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিআরপিসহ বিভিন্ন সংগঠন কোথা থেকে কত টাকা কী বাবদ অনুদান নিয়েছে এবং কাকে কত টাকা কী বাবদ অনুদান দিয়েছে, তা প্রকাশ করা।
  • তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের মালিক, রানা প্লাজার মালিক ও রানা প্লাজার গার্মেন্টসের মালিকদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাঁদের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা।
  • নিহত শ্রমিকদের স্মরণে রানা প্লাজা ভবনের সামনে ও জুরাইন কবরস্থানে স্থায়ীভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা।
  • ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক হত্যা দিবস এবং গার্মেন্টসশিল্পে সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা এবং যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই কারখানাগুলো থেকে পণ্য সংগ্রহ করত, তাদের নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।

বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি

বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অরবিন্দ ব্যাপারী বলেন, ‘২০১২ সালে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, এরপর ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ধসের মতো ঘটনা ঘটল। কিন্তু এখন পর্যন্ত দোষী ব্যক্তিদের, যারা শ্রমিক হত্যাকারী, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হলো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই শ্রমিক হত্যার বিচার, শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ, শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং আবাসন থেকে শুরু করে কোনো কিছুর ব্যবস্থা বিগত সরকারের আমলে করতে পারেনি। এতে প্রমাণিত হয়, তারা কেউই শ্রমিকবান্ধব সরকার ছিল না।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসে সরকারি হিসাবে ১ হাজার ১৩৮ জন মারা গেছে। কিন্তু আমরা জেনেছি, মারা গেছে ১ হাজার ১৭৫ জন। ২ হাজার ৫০০ মতো মানুষ বর্তমানে পঙ্গুত্ববরণ ও শারীরিক নানা জটিলতার মধ্যে আছে। ১৩ বছর যাবৎ ক্ষতিপূরণ, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করতেছি। আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার—কেউই আমাদের দাবি পূরণ করেনি।’

নিখোঁজের মায়ের আর্তি

আজ সকালে ঘটনাস্থলের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন রানা প্লাজা ধসের পর থেকে নিখোঁজ নাহিদুল ইসলামের মা ফেরদৌসী বেগম। তাঁর দাবি ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তিনি জানেন না, ছেলে জীবিত নাকি মৃত। ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘নাহিদুল ৫ তলায় কাটিং সেকশনে কাজ করতেন। লাশ পাই নাইক্কা, দ্বারে দ্বারে ঘুরি। ছেলেক দেহা পারলাম না। লাশও পাইলাম না। ছেলের একটা বাচ্চা আছে। সরকার মুখের দিক চায় না। এখন পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে বেড়াই। দেখি ছেলে বার হই গেল, নাকি মরে গেল।’

রানা প্লাজা ধসে নিহত রিনা আক্তারের ছবি বুকে চেপে ঘটনাস্থলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মা রাশেদা বেগম। ঘটনার বিচার ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ চান তিনি। রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। মাইয়াটার বয়স তখন ১৪ বছর হইলেও লম্বা ছিল। সে কাজ কইরা আমাগো খাওয়াইতো। প্রথমে সাভারের জোরপুলের ওই দিকে একটা গার্মেন্টসে ঢুকছিল, পরে বন্ধ হইয়া গেলে রানা প্লাজার ইথার টেক্স গার্মেন্টসে অপারেটরের কাজ নেয়। লাশ পাইছি দুই দিন পর। তাঁর হাত ভাইঙ্গা গুঁড়াগুঁড়া হইয়া গেছিলো, শরীর পুইড়া গেছিলো। দোষী ব্যক্তিদের বিচার চাই আর যাতে ক্ষতিপূরণ পাই, সেই ব্যবস্থা যেন হয়।’

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একই স্থানে রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে এবং ঘটনার প্রতিবাদে ঘটনাস্থলের সামনে অবস্থিত অস্থায়ী বেদিতে মোমবাতি প্রজ্বালন করে একই দাবি জানানো হয়েছিল।