রানা প্লাজার ধসের ১৩ বছর পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত অনেক দিক থেকে বদলে গেছে। কারখানা হয়েছে তুলনামূলক নিরাপদ, কমপ্লায়েন্স বেড়েছে, আর সবুজ কারখানার কারণে বৈশ্বিক ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের আড়ালে রয়েছে আরও জটিল বাস্তবতা। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি কষ্ট, কর্মক্ষেত্রে চাপ, আর উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা— সব মিলিয়ে পুরো চিত্রটি এখনও অসম্পূর্ণ।
শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা
শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা বলছেন, নিরাপত্তায় উন্নতি হয়েছে ঠিকই। নারায়ণগঞ্জের এক নারী শ্রমিক জানান, এখন কারখানায় ফায়ার এক্সিট আছে, নিয়মিত মহড়াও হয়। তবে উৎপাদন চাপ এখনও বেশি, লক্ষ্য পূরণ না হলে মজুরি কাটার ঝুঁকি থাকে। গাজীপুরের এক শ্রমিকের ভাষায়, কিছু কারখানায় শ্রমিকদের সংগঠন গঠনে নিরুৎসাহিত করা হয়, সব সময় চাকরি হারানোর ভয় কাজ করে। আরেকজন শ্রমিক বলেন, আগে ফায়ার এক্সিট কী সেটাই জানা ছিল না, এখন প্রশিক্ষণ আছে, কিন্তু বাস্তব জরুরি পরিস্থিতিতে সবাই ঠিকভাবে সাড়া দিতে পারে না। এই অভিজ্ঞতাগুলো বলেছে, কাঠামোগত নিরাপত্তা বাড়লেও শ্রমিক অধিকার ও উৎপাদন চাপ এখনও বড় উদ্বেগ।
উদ্যোক্তাদের আর্থিক বোঝা
খাতটির রূপান্তরে বড় আর্থিক মূল্য দিতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। হাসিন কায়াবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়েজ আহমেদ খান বলেন, রানা প্লাজার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সে অনুযায়ী দাম বাড়ায়নি। ফলে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে পড়েছে। তুয়া হা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসানুল রাসেলও একই কথা বলেন। তার মতে, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে ব্যাপক সংস্কার করতে হয়েছে, যার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু অর্ডারের দাম না বাড়ায় এখনও সেই ঋণের চাপ বহন করতে হচ্ছে। প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, রানা প্লাজা খাতটিকে বদলে দিতে বাধ্য করেছে। নিরাপত্তা ও সবুজ অবকাঠামোয় বিনিয়োগের ফলে আন্তর্জাতিক সুনাম বেড়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চায়।
সবুজ কারখানার উত্থান
রানা প্লাজার পর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি হলো পরিবেশবান্ধব বা সবুজ কারখানার উত্থান। বর্তমানে দেশে ২১০টির বেশি এলইইডি সনদপ্রাপ্ত গ্রিন গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে, যার অনেকগুলো প্লাটিনাম ও গোল্ড মানের। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সবুজ পোশাক কারখানা এখন বাংলাদেশেই। এসব কারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পানি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব নকশা ব্যবহার করা হয়। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সবুজ বিনিয়োগ উৎপাদন ব্যয় অনেক বাড়িয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এর যথাযথ মূল্য পাওয়া যায় না।
নিরাপত্তা পরিদর্শন ও সংস্কার
রানা প্লাজার পর ইউরোপ-ভিত্তিক অ্যাকর্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক অ্যালায়েন্স উদ্যোগের মাধ্যমে হাজার হাজার কারখানায় নিরাপত্তা পরিদর্শন চালানো হয়। এতে কাঠামোগত নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ও অগ্নি নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়। কারখানাগুলোকে ভবনের কাঠামো শক্তিশালী করা, আধুনিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন, স্প্রিংকলার ও ফায়ার ডোর বসানো এবং নিয়মিত মহড়া চালুর মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এসব সংস্কারে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এই ব্যয় অনেক কারখানার জন্যই সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কারখানা বন্ধের চিত্র
খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত এক দশকে উচ্চ কমপ্লায়েন্স ব্যয়, কম মুনাফা, তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গাজীপুরের এক মাঝারি কারখানা মালিক জানান, শুধু নিরাপত্তা উন্নয়নে ৭ থেকে ৮ লাখ ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু ক্রেতারা দাম বাড়ায়নি, ফলে ঋণ বেড়েছে, লাভ কমেছে, শেষ পর্যন্ত অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
ক্রেতাদের চাপ
কারখানা মালিকদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা একদিকে কঠোর কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড চাপিয়ে দেয়, অপরদিকে কম দামের জন্য দরকষাকষি চালিয়ে যায়। অনেক সময় ‘বাইং হাউস’-এর চাপের কারণে উৎপাদন খরচের নিচে দামে অর্ডার নিতে বাধ্য হতে হয়। ২০১৩ সালের আগে যেখানে নিরাপত্তায় বিনিয়োগ কম ছিল, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং মুনাফা বেশি ছিল, সেখানে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে কমপ্লায়েন্স ব্যয় বেশি, জ্বালানি সংকট উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে, ব্যাংক ঋণের চাপ রয়েছে, আর বৈশ্বিক বাজারে দামের প্রতিযোগিতা তীব্র। সব মিলিয়ে এখন একটি গার্মেন্টস কারখানা পরিচালনা করা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
রানা প্লাজার ১২ বছর পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বড় পরিবর্তন এসেছে— কারখানা হয়েছে নিরাপদ, কমপ্লায়েন্স জোরদার হয়েছে, সবুজ উৎপাদনে বিশ্বে নেতৃত্বও তৈরি হয়েছে। তবু খাতটির পুনরুদ্ধার এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।



