রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি)-তে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ১৯তম ঢাকা অটো সিরিজ অব এক্সিবিশন। আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে নতুন মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নানা ডিজাইনের বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল (ই-বাইক)। দেশে চলমান জ্বালানিসংকটের কারণে মানুষের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যা প্রদর্শনীর দর্শনার্থীদের ভিড়েই স্পষ্ট। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের দর্শনার্থীরা বেশি আগ্রহ নিয়ে ঘুরছেন ই-বাইকের স্টলগুলোতে।
দর্শনার্থীদের আগ্রহ ই-বাইকে
আজ দুপুরে প্রদর্শনীতে আসেন রাজধানীর বাড্ডার বাসিন্দা ফাহিম আহসান। তিনি বিভিন্ন স্টল ঘুরে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। এই তরুণ বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল কেনার পরিকল্পনা করছি। দেশে চলমান জ্বালানিসংকটে ই-বাইক কেনার আগ্রহ আরও বেড়েছে।’ দর্শনার্থীদের এমন প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, জ্বালানিসংকটের এই সময়ে ই-বাইক একটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণ
প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড ‘ভি মোটো’। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমেই দেশে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল ব্র্যান্ডটি। বাংলাদেশে এর পরিবেশক সিমবা মোটরস। মোট সাতটি মডেলের ই-বাইক নিয়ে এসেছে ভি মোটো, যার দাম শুরু ১ লাখ ৯ হাজার টাকা থেকে। তবে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ কেড়েছে তাদের ফ্ল্যাগশিপ মডেল ‘স্ট্যাশ’। ১৪ দশমিক ৪ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই ই-বাইক এক চার্জে চলে ১৮০ কিলোমিটার।
সিমবা মোটরসের চেয়ারম্যান সোহেল বিন আজাদ বলেন, ‘এক বছর ধরে এই ব্র্যান্ডটি দেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। নকশা ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এসব ই-বাইক ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়বে। এ ছাড়া ব্যাটারির স্থায়িত্ব ও পারফরম্যান্সের জন্য ব্র্যান্ডটির গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস রয়েছে।’
একই ছাদের নিচে পাঁচটি প্রদর্শনী
আইসিসিবিতে অটো সিরিজ অব এক্সিবিশন বাংলাদেশের অধীনে একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘১৯তম ঢাকা মোটর শো’, ‘১০ম ঢাকা বাইক শো’, ‘৯ম ঢাকা অটো পার্টস শো’, ‘৮ম ঢাকা কমার্শিয়াল অটোমোটিভ শো’ এবং ‘৩য় ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) বাংলাদেশ এক্সপো’। এই আয়োজন করেছে কনফারেন্স অ্যান্ড এক্সিবিশন ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস (সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ)। প্রদর্শনীটি সবার জন্য প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উন্মুক্ত। তবে প্রবেশে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হবে।
চীনা ব্র্যান্ড সিএফ মটো ও উলিং
প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে চীনের মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক সিএফ মটো বাংলাদেশ। দেশে এই ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল সংযোজন করে বাজারজাত করে নিউ গ্রামীণ মোটরস। তারা মোট ৭টি প্রচলিত জ্বালানিচালিত ও ৪টি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছে। জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলের দাম ২ লাখ ৮৭ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর ই-বাইকের দাম ১ লাখ ৪৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত।
চীনের আরেক ব্র্যান্ড উলিং-এর গাড়ি বাজারজাত করছে র্যানকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজ। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল ব্র্যান্ডটি। তাদের তিনটি মডেলের মধ্যে প্লাগইন হাইব্রিড (পিএইচইভি) ‘ড্যারিয়ন’ সরাসরি আমদানি করা হচ্ছে, আর জ্বালানিচালিত ‘আলমাজ আরএস’ ও ‘কর্টেজ’ দেশেই সংযোজন করা হয়। মেলা উপলক্ষে কর্টেজের দাম ২৫ লাখ টাকা, আলমাজ আরএস ৩২ লাখ টাকা, আর ড্যারিয়নের দাম ৪৩ লাখ টাকা। তিনটিই সাত সিটের। র্যানকনের কর্মকর্তারা দাবি করেন, ড্যারিয়ন শুধু ব্যাটারিতে ১২৫ কিলোমিটার এবং পূর্ণ জ্বালানি ও চার্জে ১ হাজার কিলোমিটার চলবে।
মিতসুবিশি ও দেশীয় উদ্যোগ
প্রদর্শনীতে মিতসুবিশি মোটরসের নতুন মডেল ‘ডেস্টিনেটর’ আনা হয়েছে। দেড় হাজার সিসির এই গাড়ির দাম ৬৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির লক্ষ্যে ২০২২ সালে কারখানা তৈরির কাজ শুরু করা বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তাদের প্রাথমিক মডেল (প্রোটোটাইপ) ‘সার্জ জেড’ প্রদর্শন করছে। এটি পিএইচইভি ও পুরোপুরি বৈদ্যুতিক—দুই ধরনের হবে। দাবি করা হচ্ছে, পুরোপুরি বৈদ্যুতিক সংস্করণ এক চার্জে ৩৫০-৪৫০ কিলোমিটার চলবে।
বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবীর বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশে এই গাড়ি সংযোজন করা হবে। প্রাথমিকভাবে দাম ৪০-৪৫ লাখ টাকার মধ্যে থাকবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমানো হলে দাম আরও কমবে।’
বহু দেশের অংশগ্রহণ
এবারের প্রদর্শনীতে জাপান, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশের ৭০টির বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছে। উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডের মধ্যে আছে মিতসুবিশি, টয়োটা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, হোন্ডা, এমজি, প্রোটন, চাঙ্গান, গ্যাক মোটরস, ডংফেন, জিহো বাংলাদেশ, সিএফ মটো বাংলাদেশ, লংজিয়া, ভিমোটো, ফোটন, ফোরল্যান্ডস প্রভৃতি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
দুপুরে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেমস-গ্লোবালের (ইউএসএ অ্যান্ড এশিয়া প্যাসিফিক) প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেহেরুন এন ইসলাম, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম এ কামাল বিল্লাহ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পরিচালক অনুপম সাহা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মহাপরিচালক গাজী এ কে এম ফজলুল হক ও বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ প্রমুখ।



