দিনভর বিক্ষোভ, পুলিশি অভিযান ও নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর শেষ পর্যন্ত সোমবার (১ জুন) রাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
পর্ষদ সভার বিস্তারিত
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রাত ৯টার দিকে ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে পর্ষদ সভা শুরু হয় এবং প্রায় ৪০ মিনিট স্থায়ী হয়। সভায় পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্য অংশ নেন। সভায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পর্ষদের একজন স্বতন্ত্র পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়মিত পর্ষদ সভার মতোই কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সভা শুরু হয়। এজেন্ডাভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শেষে ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়।
বিক্ষোভ ও পুলিশি অভিযান
এর আগে দিনের শুরু থেকেই রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
সকালে মানববন্ধন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জননিরাপত্তা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তারা ব্যবস্থা নিয়েছে।
পর্ষদ সভা আয়োজনে বাধা
ব্যাংক সূত্র জানায়, পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুপুর আড়াইটায় প্রধান কার্যালয়ে নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পর্ষদ সভা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ চলতে থাকায় চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম সশরীরে সভায় যোগ দিতে পারেননি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে অনলাইনে সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে আন্দোলনকারীদের চাপ ও প্রধান কার্যালয়ের ভেতরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে প্রথম দফায় অনলাইন সভার উদ্যোগও ভেস্তে যায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত সভা আয়োজন সম্ভব না হলেও রাতে শেষ পর্যন্ত ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে পর্ষদ সভা সম্পন্ন হয়।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়ে বিরোধ
ঈদের আগে ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি রাজনৈতিক পক্ষ বিভিন্ন ব্যানারে ওই নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছে। ঈদের ছুটির মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালনায় হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সড়কে আন্দোলন করে পরিবর্তন আনার সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
সোমবারের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন এখনো শেষ হয়নি। নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে বিরোধ, এমডি পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।



