ইসলামী ব্যাংকে আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাধীন পর্ষদ গঠনের দাবি গ্রাহকদের
ইসলামী ব্যাংকে আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাধীন পর্ষদ চান গ্রাহকরা

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আমানতকারীদের আস্থা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন ব্যাংকটির গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

আস্থা সংকটের পটভূমি

ব্যাংকটির মালিকানা, পরিচালনা ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে মাঠে নেমেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। সংগঠনটি মনে করছে, ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বাভাবিক লেনদেন নিশ্চিত করতে হলে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই।

আগামী কর্মসূচি

এ দাবিতে আগামী সোমবার (২২ জুন) সকাল ১১টায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক অভিমুখে মিছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। এর আগে রবিবার (২১ জুন) ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সাত দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার অংশ নেন। বক্তারা বলেন, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং বৃহৎ অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেক আমানতকারী তাদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিতর্ক সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করেছে, তবুও আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী করতে হবে

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের মতে, সংকট উত্তরণে প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হতে হবে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা পর্ষদ গঠন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত পেশাদার নেতৃত্ব ছাড়া ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সংগঠনটির সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন; ২০১৭ সালে মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে বঞ্চিত শেয়ারহোল্ডারদের বৈধ মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া; ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন; অভিযুক্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা; ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা; বিতর্কিত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিরত থাকা; ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিতর্কিত বিধান সংশোধনের মাধ্যমে অভিযুক্ত গোষ্ঠীর পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ করা।

গ্রাহকদের উদ্বেগ এখনও কাটেনি

অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, "সাত দফা দাবির ভিত্তিতে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক মনে হলেও এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। ফলে শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।"

ব্যাংকিং খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি হওয়ায় এর স্থিতিশীলতা পুরো আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটির প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে নয়, বরং করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ইসলামী ব্যাংকে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং লুণ্ঠিত অর্থ পুনরুদ্ধারের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা গেলে আমানতকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে। আর সেটিই হবে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি।