গুলশান থানায় মামলা করতে গিয়ে ৭ ঘণ্টা হয়রানি, ভুক্তভোগীর অভিযোগ
গুলশান থানায় মামলা করতে গিয়ে ৭ ঘণ্টা হয়রানি

রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করতে গিয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা হয়রানির শিকার হয়েছেন আদিল হোসেন (ছদ্মনাম) নামের এক ভুক্তভোগী। তিনি একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। গত ১৮ জুন রাতে গুলশান–১ গোলচত্বর এলাকায় তাঁর প্যান্টের পকেট কেটে মুঠোফোন চুরি হয়। পরে তাঁর বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে ১৪ ধাপে ৮৫ হাজারের বেশি টাকা তুলে নেওয়া হয়।

ডিবির পরামর্শে থানায় যান

ঘটনার প্রতিকার পেতে রোববার সকালে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার নিরাপত্তা বিভাগে যান। সেখানে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। অভিযোগ শুনে ডিবির কর্মকর্তারা তাঁকে গুলশান থানায় একটি মামলা করার পরামর্শ দেন। তাঁদের পরামর্শেই বেলা আড়াইটার দিকে দুলাভাই ও মাকে নিয়ে গুলশান থানায় যান তিনি।

থানায় প্রবেশের পর শুরু হয় বিড়ম্বনা

থানায় গিয়ে প্রথমে অভ্যর্থনা ডেস্কের পুলিশ সদস্যকে জানান, তিনি ডিবি অফিস থেকে এসেছেন এবং মামলা করতে চান। ওই পুলিশ সদস্য জানান, ওসি স্যার এখন দেখা করতে পারবেন না। কয়েক দফা অনুরোধের পর জানানো হয়, ওসি স্যার মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন, কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর আবারও অনুরোধ করলে অপর এক পুলিশ সদস্য বলেন, ওসি স্যার লাঞ্চ করছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ সময় আদিল হোসেনের এক স্বজন গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সরকারি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে ফোন ধরেন পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান। তিনি জানান, ওসি ছুটিতে আছেন এবং তিনিই ভারপ্রাপ্ত ওসির দায়িত্বে আছেন। মামলা করতে হলে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টাইপরাইটার নেই বলে আরও দেরি

পরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে ভুক্তভোগীদের নিজ কক্ষে ডেকে পাঠান মোখলেসুর রহমান। কক্ষে ঢুকতে গেলে আরও পাঁচ মিনিট বাইরে অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে বিকেল চারটার দিকে তাঁদের কক্ষে ঢুকতে অনুমতি দেন। কক্ষের ভেতরেও কিছু সময় বসিয়ে রাখা হয়। এর মধ্যে দ্রুত মামলা গ্রহণ করতে পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমানকে মুঠোফোনে নির্দেশ দেন। পরে ঘটনার বিস্তারিত শোনার পর তিনি ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করে কোন আইন ও ধারায় মামলা নেবেন তা জিজ্ঞাসা করেন। আইন ও ধারা জানার পর তিনি জানান, এই মুহূর্তে থানায় কোনো টাইপরাইটার নেই, আরও অপেক্ষা করতে হবে। তিনি তাদের দুপুরের খাবার খেয়ে আসতে বলেন।

দুপুরের খাবার শেষ করে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁরা আবার থানায় আসেন। আসার পর কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান, মোখলেসুর রহমান বিশ্রামে গেছেন। কখন আসবেন তা বলেননি, মামলা নেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও দেননি। আরও অপেক্ষা করতে হবে।

অবশেষে এজাহার জমা, কিন্তু কপি পেতে হবে পরদিন

আরও কিছু সময় অপেক্ষার পর মামলার এজাহার লেখা শুরু হয়। প্রথমে যে কর্মকর্তা এজাহার লেখা শুরু করেন, তাঁর লেখা ঠিক না হওয়ায় অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাত পৌনে আটটার দিকে এজাহারের খসড়া প্রস্তুত হলে মোখলেসুর রহমান কিছু বিষয় সংশোধন করতে নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধন করে প্রায় সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত ৯টার দিকে এজাহার প্রস্তুতের কাজ শেষ হয়। এরপর তাঁদের জানানো হয়, মামলার কপি আজ হাতে পাবেন না, পেতে হলে আগামীকাল (সোমবার) আবার আসতে হবে।

আদিল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে কখনো থানা–পুলিশ করা লাগেনি। ফোন চুরি ও টাকা খোয়া যাওয়ার পরে মানসিকভাবে এমনিতেই বিপর্যস্ত ছিলাম। আইনি প্রতিকার পেতে এসে যে ভোগান্তি হলো, আর তাতে আরও ভেঙে পড়েছি। আড়াইটায় থানায় এসে রাত ৯টা পর্যন্ত থেকেও কাজ সম্পন্ন হলো না। আইনি প্রতিকার পেতে এসেও যদি এমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে আর যাব কোথায়?’

পুলিশ কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন এত সময় লাগল, সেটা বাদীকেই জিজ্ঞাসা করেন। তাহলে উত্তরটা পেয়ে যাবেন। তার পরও যদি কিছু জানার থাকে, তাহলে একসময় সময় পেলে থানায় আইসেন, বুঝিয়ে বলব। চায়ের দাওয়াত রইল।’

গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানতাম না। আপনার মাধ্যমে অবগত হলাম। ঘটনাটির যথাযথ অনুসন্ধান করব। কেন তারা সেবাপ্রত্যাশীর প্রতি সংবেদনশীল হয়নি, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখব। তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। পরে যেন তারা এ বিষয়ে সতর্ক থাকে, সেটি নিশ্চিত করব।’

গুলশানের বিশেষ গুরুত্ব

ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে দায়িত্বরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের বসবাস। প্রধানমন্ত্রীও এই থানা এলাকায় বসবাস করেন। এসব বিবেচনায় গুলশানে আইনশৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। সেখানে গুলশান থানায় গিয়ে একটি মামলার এজাহার দায়েরের জন্য এত সময় লাগার কথা তুলে ধরে ভুক্তভোগীরা বলেছেন, এখানে এভাবে ভুগতে হলো। তাহলে দেশের অন্যান্য থানায়ও কি সেবা পেতে মানুষকে এমন হয়রানির শিকার হতে হয়?