আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আইএলএফএসএল-এর এমডি অপসারণ
আর্থিক অনিয়ম ও পেশাগত অসদাচরণের দায়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (আইএলএফএসএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
প্রমাণিত অভিযোগের তালিকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক আইন লঙ্ঘনের বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য অনিয়মগুলো হলো:
- জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানির এমডি থাকাকালীন তিনি কিউ এস কসমেটিকস লিমিটেডকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট সিলিং বা ঋণের ঊর্ধ্বসীমা লঙ্ঘন করেছেন।
- ওই ঋণের বিপরীতে সুদের হার ১৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ করে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করেছেন।
- আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩-এর আওতায় জিএসপি ফাইন্যান্সকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল, যা তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গোপন করেন।
- ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হিসেবে যোগদানের সময় তিনি হলফনামায় এই তথ্য গোপন করেন।
- বোর্ড সভার কার্যবিবরণী জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দলকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ না করা এবং ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে উল্লেখ করা হয়।
কারণ দর্শানোর নোটিশ ও অপসারণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে গত ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছিল। তবে তাঁর দেওয়া জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং ব্যাংক কোম্পানির স্বার্থ পরিপন্থী কাজের জন্য তাঁকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী অপসারণ করা হয়েছে।
আদেশে আরও বলা হয়, জনস্বার্থে এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এমডি হিসেবে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণ ও অতীত অনিয়ম
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ছিল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সালে শেয়ার কিনে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় হাল ইন্টারন্যাশনাল, বিআর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ ও নিউ টেক এন্টারপ্রাইজ। এসব প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালেই কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। আবার হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পি কে হালদার নিজে; আর তাঁর ভাই প্রীতিশ কুমার হালদারের শেয়ার ছিল ১০ শতাংশ।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নামে-বেনামে টাকা বের করেন পি কে হালদার। পরে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় নিজের পছন্দমতো লোক বসান তিনি। চার পরিচালকের মাধ্যমে ৩৪টি হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। এ ছাড়া শীর্ষ কর্মকর্তারা ঋণের নামে ১৫০ কোটি টাকা নিয়ে যান। এসব অনিয়মের জের টানতে হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের। ফলে গ্রাহকেরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।
এই ঘটনাটি আর্থিক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



