অভিযাত্রীরা দুশ্চিন্তার মধ্যে রাত কাটিয়েছে। শৈলজিত রায় আর লাকপা শেরপা এখনো নিখোঁজ। ঠিক একদিন আগে, মানে চব্বিশ ঘণ্টা আগে তারা দলের অন্যদের সঙ্গে তাঁবু থেকে বেরিয়েছিল তিলক লিম্বুর খোঁজে। আশ্চর্যের বিষয় হলো বাকি অভিযাত্রীরা সবাই ফিরে এসেছে, শুধু শৈলজিত-লাকপা ফেরেনি। এতে দলের মধ্যে ভয় আর উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। সবাই ভাবছে, পর্বতের বিপৎসংকুল পথে বড় ধরনের বিপদ ঘটেছে কি না কে জানে।
রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে কাউকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। বরফে ঢাকা পথ আর কনকনে হাওয়া সবাইকে থামিয়ে দিয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে সবাইকে অপেক্ষা করতে হয়েছে সকাল পর্যন্ত। ভোরের আলো ফুটতেই তাঁবুর বাইরে এসে একে একে সবাই জড়ো হলো। তখনই ইখতিয়ার হামিম এগিয়ে এসে বললেন, ‘আজও বেরোতে হবে। যেভাবে হোক সঙ্গীদের খুঁজে বের করতেই হবে। তাদের ছাড়া আমরা ফিরে যেতে পারব না।’
ইখতিয়ার হামিমের কথায় কেউ আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। শেরপারা রাগে ফুঁসছে, সুযোগ পেলেই তাকে দু-চার কথা শুনিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। দলের অভিযাত্রী দুজনও তার সঙ্গে ভালো আচরণ করছেন না। ইখতিয়ার মনে মনে ভাবছেন, তিলক লিম্বু না হয় পালিয়ে গেছে; কিন্তু শৈলজিতের দল গেল কোথায়? তারা তো পালানোর মতো মানুষ নয়। এতটা দায়িত্বশীল মানুষ হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে গেলই বা কীভাবে? এই রহস্যটাই এখন তাকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে।
এছাড়াও মাত্র দুদিনের মধ্যে পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। মাছাপুচ্ছ্রের চূড়ায় ওঠার যে স্বপ্ন নিয়ে তারা এসেছিল, তা এখন কল্পনায় আটকে গেছে। দলের সবাই হতাশ, আর বিভ্রান্ত। কেউ কারও সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলছে না, সবাই আতঙ্কিত হয়ে বসে আছে। ইখতিয়ার জানেন, নিখোঁজদের খোঁজ না মিললে শেরপারা আরও খেপে যাবে। আর তখন যে কোনো বড় ধরনের অঘটন ঘটাতে পারে তারা। এই ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ইখতিয়ার বুঝতে পারছেন এখন শুধু পর্বতে বিপদ নয়, দলের ভেতরের অশান্তিও তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
সবকিছু ভেবেচিন্তে ইখতিয়ার হামিম আর সামিটের নাম মুখে আনলেন না। মনে মনে ঠিক করেছেন নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া গেলে তো ভালোই, না হলে দু-একদিনের মধ্যে নিচে নেমে যাবেন। এই নির্জন ভয়ানক পরিবেশে তিনি নিজেকে মোটেও নিরাপদ মনে করছেন না। এদিকে রিনজো খড়কা আর পবন থাপার মন-মেজাজও খারাপ। তাঁবুর ভেতরে চাপা উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। হঠাৎ রিনজো ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘ইখতিয়ার, তোমার দুর্বল নেতৃত্বের কারণেই আজ এই অবস্থা হয়েছে।’
ইখতিয়ার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কথাটার মানে বুঝলাম না রিনজো, তুমি কী বুঝাতে চাচ্ছ, পরিষ্কার করে বলো?’ রিনজো উত্তর দিলেন, ‘তুমি শেরপাদের মনোভাব ঠিকভাবে ধরতে পারোনি। তারা একবার খেপে উঠলে কী করতে পারে, সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই নেই। আমি এখন অসুস্থ বোধ করছি... তাই আর কথা বাড়াতে চাই না।’ তার কথা শুনে সবাই মনে মনে সায় দিয়ে গেল। পবন থাপা মুখে কিছু না বললেও তার চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তিনি রিনজোকে সমর্থন করেছেন।
ইখতিয়ার অনুভব করলেন, দুইদিক থেকেই বিপদ ঘনিয়ে আসছে। একদিকে তিনজন নিখোঁজ; অন্যদিকে দলের ভেতরে অশান্তির আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। দুই মিলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। রিনজোর কথার জবাব দিতে গিয়ে তিনি বুঝে গেলেন দলে তার আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এখন কিছু বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, তাই তিনি নীরব রইলেন। শেরপারা নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় শলা-পরামর্শ করছে। তাদের চোখে-মুখে রাগ আর অবিশ্বাস ফুটে উঠেছে। আর মাঝে মাঝে ইখতিয়ারের দিকে তাকিয়ে তারা কিছু বলছে, মনে হচ্ছে সবকিছুর জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পবন থাপা বললেন, ‘এসব নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আমরা যদি এখনই খুঁজতে শুরু না করি, তাহলে শৈলজিত আর লাকপাকে হয়তো আর জীবিত পাব না; তার ওপরে অক্সিজেন সংকটে পড়লে তো কথাই নেই। দেরি করো না, সবাই বেরিয়ে পড়ো এখনি। রিনজো তুমি তাঁবুতে থাকো, অসুস্থ শরীর নিয়ে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে না।’ পরামর্শ শেষে সবাই দলবেঁধে দক্ষিণ দিকে রওয়ানা দিলো। গতকাল শৈলজিত লাকপাকে নিয়ে সেই দিকেই গিয়েছিল, তাই সবার মন বলছে হয়তো তাদের খোঁজ পাওয়া যাবে দক্ষিণে গেলেই।
রিনজো খড়কা আর যেতে পারলেন না। তার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, সঙ্গে বমি বমি ভাব। অক্সিজেন সংকটে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই তিনি মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে তাঁবুর ভেতরে শুয়ে রইলেন। ইখতিয়ার তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে রিনজোর দিকে তাকালেন। তার মনে হলো, এই অভিযানে শুধু নিখোঁজদের খোঁজ করাই নয়, দলের প্রতিটি সদস্যের জীবনও এখন ঝুঁকির মধ্যে আছে। তিনি বুঝতে পারলেন সামনে এগোলে নতুন বিপদের মুখোমুখি হতে হবে, আর পেছনে ফিরলে নিখোঁজদের রহস্য চিরদিনের মতো অজানা থেকে যাবে। সবকিছু জেনেশুনেও ইখতিয়ার হামিম শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলেন নিখোঁজদের খোঁজে পা বাড়াতে। তার সংকল্প, যতই বিপদ আসুক, রহস্যের পর্দা ভেদ করতে চেষ্টা করবেন তিনি।
রিনজো খড়কা একা শুয়ে আছেন। তাঁবুর ভেতর এখন নিস্তব্ধতা, আর বাইরে থেকে ভেসে আসছে বাতাসের শব্দ। প্রচণ্ড হাওয়ায় তাঁবুর কাপড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কয়েক মিনিট আগেও আকাশ ছিল একেবারে পরিষ্কার, সূর্যের আলো বরফে ঢাকা পর্বতের গায়ে ঝলমল করছিল, চারপাশ সোনালি আলোয় ভেসে যাচ্ছিল। অথচ মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পাল্টে গেল। পর্বতের উপরে মেঘ জমে উঠল, সূর্যের আলো নিভে গিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল অন্ধকার। হিমালয়ের উপরের দিকের আবহাওয়া কখনোই স্থির থাকে না। এক মুহূর্তে শান্ত, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় বইতে শুরু করে। তাই হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলেও অভিযাত্রীদের মনে কোনো ভয় জন্মায় না। তারা জানে, এটাই পর্বতের চিরাচরিত নিয়ম।
রিনজোর শরীর খুব দুর্বল; মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে শুয়ে আছেন। মাথার তীব্র ব্যথায় তিনি নড়তেও পারছেন না। চারপাশে বাতাসের শব্দ কানে আরও তীব্র হয়ে বাজছে, বুঝতে পারছেন ঝড় আসন্ন। আবহাওয়ার পরিস্থিতি দেখতে রিনজো তাঁবুর কাপড় সরিয়ে বাইরে তাকালেন। চোখ মেলতেই দেখলেন, চারপাশে রাতের মতো আঁধার ঘনিয়ে আসছে। সেই আঁধারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে তিলক লিম্বুর মতো কেউ একজন। প্রথমে তার মনে হলো, তিলক হয়তো ফিরে এসেছে। বিষয়টা ভেবেই তিনি চোখ মেলে তাকিয়ে রইলেন।
পরিশেষে ভালো করে তাকাতেই বোঝা গেল সেখানে কোনো মানুষজন নেই। শুধু তিলক লিম্বুর অবয়বের মতো একটা রেখা ভেসে উঠছে। যে রেখাটা একবার সামনের দিকে এগিয়ে আসছে, আবার থেমে যাচ্ছে। রিনজোর শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। চোখের ভুল কি না, নিশ্চিত হতে তিনি চোখ মুছে আবার তাকালেন। এবারও স্পষ্ট দেখলেন কিছু একটা ভাসছে। রিনজো খড়কার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তিনি নড়তে চাইছেন, পারছেন না। শরীর পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। হাত-পা অসাড় হয়ে আছে, শরীরে শক্তি নেই। তিলক তার দিকে এগিয়ে আসছে, যেন অন্ধকারের ভেতর থেকে তাকে টেনে নিয়ে যাবে।
অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়েই তার শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে তার। এমনি সময় তিলকের কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘একা একা কি করছ, আমার সঙ্গে চলো রিনজো দাই।’ শব্দটা এতটাই স্পষ্ট যে, মনে হলো পাশে দাঁড়িয়েই তিলক কথা বলছে। রিনজোর চোখ বড় হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারছেন না এটা কি সত্যিই তিলকের কণ্ঠস্বর, নাকি রহস্যময় কিছু। এরই মধ্যে বাতাসে ভেসে আসছে ধূপের গন্ধ। সেই গন্ধে রিনজো মাতোয়ারা হয়ে গেলেন। তার শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। তিনি অবাক হলেন, অক্সিজেন মাস্কের ভেতর কীভাবে ধূপের গন্ধ প্রবেশ করল? গন্ধটা তাকে আরও টেনে নিচ্ছে। রিনজো নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তার মনে প্রশ্ন জাগল, অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে ধূপের গন্ধ আসছে কীভাবে? মাস্ক তো বাইরের সবকিছু আটকে রাখার কথা।
গন্ধটাকে আরও গভীরভাবে টেনে নিতে রিনজো খড়কা উতলা হয়ে উঠলেন। এক ঝটকায় খুলে ফেললেন মাস্কটা। হুড়হুড় করে ধূপের গন্ধ ঢুকে পড়ল তার ফুসফুসে। তিনি চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারছেন না, বরং মাস্ক খুলতেই বুক ওঠানামা করতে লাগল কামারের হাঁপরের মতো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন কমে যাওয়ায় চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। ঠিক তখনই তিনি দেখলেন, বরফের ভেতর থেকে বিশাল এক দানব এগিয়ে আসছে তার দিকে। দানবটা অনেকটাই মানুষের মতো দেখতে, তবে আকারে অস্বাভাবিক বড়। রিনজোর মনে প্রশ্ন জাগল, এটাই কি সেই কিংবদন্তির তুষার মানব ইয়েতি? চোখের পলক ফেলতেই দানবটা মিলিয়ে গেল। তিনি বুঝলেন, অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে হ্যালুসিনেশনে ভুগছেন। তাই চোখে উলটাপালটা দৃশ্য ভেসে উঠছে, কানে অদ্ভুত শব্দ ধাক্কা দিচ্ছে।
রিনজো জানেন, হিমালয়ে ইয়েতি বলে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব নেই। হ্যালুসিনেশনের কারণে অনেক সময় পর্বতারোহীরা সাধারণ একটি ভালুককেও বিশাল দানব ভেবে বসেন। এ ধরনের ভুল ধারণা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। আজ পর্যন্ত কোনো সুস্থ পর্বতারোহী ইয়েতির সাক্ষাৎ পাননি। ইয়েতি কেবল গল্প, উপন্যাস আর সিনেমার চরিত্র—বাস্তবে তার কোন অস্তিত্বই নেই। রিনজো খড়কা মরিয়া হয়ে ওয়াকিটকি হাতে তুলে নিলেন। যদি দলের কেউ কাছাকাছি থাকে, তবে হয়তো তারা এসে তাকে বাঁচাতে পারবেন। সেই চেষ্টায়ও ব্যর্থ হলেন রিনজো। ওয়াকিটকির একটা বোতামও চাপতে পারলেন না। ভয় আর অজানা আতঙ্কে তার আঙুল অসাড় হয়ে এলো। তখনই আবার তাঁবুর ভেতরে তিলকের অবয়ব নড়ে উঠল। রিনজো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ধীরে ধীরে সেটা তার দিকে এগিয়ে আসছিল। এই অবস্থায় রিনজো শ্বাস নিতেও ভুলে গেলেন। এমনকি ওয়াকিটকিও তার হাত থেকে পড়ে গেল।
রিনজো খড়কা এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এটা কোনো হ্যালুসিনেশন নয়। চোখের সামনে যা ঘটছে, তা সত্যি সত্যিই ঘটছে। তিলকের অবয়বটা মুহূর্তের মধ্যে আরও কাছে চলে এলো। আর তাঁবুর ভেতর অন্ধকারে ঢেকে গেল। বাইরে বাতাসের সঙ্গে ধূপের গন্ধ আরও ঘন হয়ে উঠল। রিনজো বুঝলেন, এটা তার কল্পনা নয়, কোনো অজানা শক্তি চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে। তিনি মরিয়া হয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলেন। পারলেন না, গলা থেকে কোনো শব্দই বের হলো না। কণ্ঠ আটকে গেছে। ঠিক তখনই তিলকের অবয়বটা আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর রিনজো খড়কা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আঁধারে হারিয়ে গেল। তাঁবুতে আর কেউই রইল না, শুধু বাতাসের শব্দ আর ধূপের গন্ধ ভেসে বেড়াতে লাগল আশপাশে।
এদিকে দুপুর গড়িয়ে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেও শৈলজিত আর লাকপাকে পাওয়া গেল না। অবশেষে ক্লান্ত অভিযাত্রীরা আবার তাঁবুর কাছে ফিরে এলো। তাঁবুর সামনে এসে তারা থমকে দাঁড়াল। তাঁবুর অবস্থা দেখে সবাই হতবাক হলেন। কাপড়-দড়ি ছেঁড়া, ভেতরের জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে চারদিকে। মনে হচ্ছিল, ঝড় এসে সবকিছু দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আকাশে ঝড়-তুফানের কোনো চিহ্নই নেই। চারপাশে বাতাস স্বাভাবিক, আবহাওয়া শান্ত। তাই তাঁবুর এই বেহাল দশা দেখে সবাই বিস্মিত হলো। রিনজো খড়কাকে না দেখে সবাই তাকে খুঁজতে লাগল। তাঁবুর দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে সবাই ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কেউ কেউ মনে করছে, হয়তো তিনি কাছেই আছেন। তাই প্রথমে আশেপাশেই খুঁজতে লাগল।
অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেও রিনজো খড়কাকে পাওয়া গেল না। সবাই বুঝে গেল—তিলক, শৈলজিত আর লাকপার মতোই রিনজোও নিখোঁজ হয়ে গেছে। যত চেষ্টা করা হোক, তাদের আর পাওয়া যাবে না। এখন একটাই পথ খোলা আছে, দ্রুত পর্বত থেকে নেমে যাওয়া। না হলে এই চারজনের মতোই বাকিদের ভাগ্যেও ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে। সবাইকে ডেকে ইখতিয়ার হামিম বললেন, ‘আমরা আর দেরি করব না। এখনই পর্বত থেকে নেমে যাব।’ পবন থাপা কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ‘এই সিদ্ধান্ত যদি দুইদিন আগে নিতে, তাহলে এতবড় বিপদে পড়তে হতো না।’
ইখতিয়ার হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। রাগ আর অভিমানের সুরে তিনি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি তো কথার কথা বলে বাহবা কুড়াচ্ছ। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল, আর সেটাই চট করে বলে দিলে। শেরপাদের মতোই হালকা কথা বলছ কেন! সবাই জানে মাছাপুচ্ছ্রে ওঠা নিষেধ। তবু তদবির করে এই প্রকল্পে যোগ দিয়েছ; আর এখন সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছ!’ শেরপারাও একইভাবে তদবির করেছে দলে ঢোকার জন্য। তিলক লিম্বু নিজেই আমাকে বলেছিল, সে সরকারের বড় কর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে শেরপাদের দলভুক্ত করেছে। সরকারি প্রকল্পে বেশি টাকা পাওয়া যাবে, এই লোভেই তোমরা সবাই ছুটে এসেছ। আর সেই লোভের শিকার হয়েছি আমরা দুই বাঙালি। বাংলাদেশ থেকে এসে আজ আমি আমার সঙ্গীকেও হারালাম। তুমি কি একবারও ভেবেছ, দেশে ফিরে আমি কী জবাব দেব? তখন কি আমার পাশে তোমরা দাঁড়াবে? নাকি আমার হয়ে শৈলজিতের পরিবারকে সব বুঝিয়ে বলবে?’
ইখতিয়ার হামিমের কথার জবাব দেয়নি কেউই। চুপ করে রইল সবাই। শেরপাদের মধ্যে যে রাগক্ষোভ ছিল এতদিন ধরে, সেটাও নিমেষেই মিলিয়ে গেল ইখতিয়ারের কথায়। নীরবতা ভেঙে পবন থাপা বললেন, ‘দুঃখিত ইখতিয়ার আসলে মাথাটা ঠিক নেই। মনে কিছু নিও না। এখন তো ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথও খোলা নেই। আমরা যদি দেরি করি, তাহলে হয়তো আর কখনো নিচে নামতেই পারব না।’ ইখতিয়ার মাথা নেড়ে বললেন, ‘ঠিক তাই। এখন আমাদের একটাই কাজ, যত দ্রুত সম্ভব নিচে নামা। মাছাপুচ্ছ্রে আর এক মুহূর্তের জন্যেও নিরাপদ নয়। ভুল বোঝাবুঝি শেষ করে চলো আমরা একসাথে পরামর্শ করি, কীভাবে নিচে নামা যায়।’
সোনাম শেরপা বলল, ‘হেলিকপ্টার তলব করো দাই।’ ইখতিয়ার ওয়াকিটকিটা হাতে নিয়ে বোতাম টিপতে লাগলেন; স্ক্রিনে ব্যাটারি ডাউন দেখাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো সবগুলো ওয়াকিটকিই একই অবস্থায় আছে; কোনোটাই কাজ করছে না। পবন থাপা বললেন, ‘ওয়াকি-টকি রেখে দাও; কোনো কাজে আসবে না। এখানে অন্য জগতের খেলা চলছে।’ ইখতিয়ার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে উপায়? দ্রুত নিচে নামতে না পারলে আমরাও বিপদে পড়ে যাব।’ পবন থাপা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘ট্রেকিং করেই নামতে হবে। দেরি করো না, এখনই রওয়ানা দিতে হবে। যতই নিচের দিকে নামতে পারব, ততই নিরাপদ থাকব।’
এক মুহূর্তের জন্যেও দেরি না করে শেরপারা দ্রুত তাঁবুর ভেতরের জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল। যা একেবারেই দরকার নেই, সেগুলো রেখে দিলো। ভারী সরঞ্জাম, অতিরিক্ত কাপড় কিংবা অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তারা আর বহন করতে চাইল না। শুধু পনেরো হাজার ফুটের কাছে পৌঁছাতে যে জিনিসগুলো প্রয়োজন, তাই সঙ্গে নিলো। কারো মুখে কোনো কথা নেই, প্রত্যেকের চোখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জায়গা থেকে চলে যেতে পারলেই তারা বাঁচে। দলের হিসাব অনুযায়ী তিন দিনের মধ্যে তারা নিচের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। পথ কঠিন হলেও সবার বিশ্বাস, একবার সেখানে পৌঁছাতে পারলেই আর বড় কোনো সমস্যার মুখে পড়তে হবে না। অন্তত এই ভয়ংকর অজানা আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে।



