পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কামড়: শীর্ষ ৯ প্রাণীর চোয়ালের ক্ষমতা
পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কামড়: শীর্ষ ৯ প্রাণী

প্রকৃতির বুকে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রাণীদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার তাদের চোয়াল। শিকার ধরা এবং আত্মরক্ষার জন্য কিছু বন্য প্রাণী অবিশ্বাস্য শক্তির অধিকারী। বিবর্তনের ধারায় এদের চোয়াল ও দাঁত হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত ও ভয়ংকর মরণফাঁদ। আমাদের পৃথিবীতে এমন কিছু স্তন্যপায়ী, হাঙর এবং সরীসৃপ রয়েছে, যাদের কামড়ের শক্তি কল্পনাতীত। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রাণীদের এই কামড়ের শক্তি বা বাইট ফোর্স পরিমাপ করা হয় নিউটন বা পাউন্ড এককে। কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি সরাসরি পরিমাপ করা হয়েছে। আবার কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি বিজ্ঞানীদের নিখুঁত অনুমান। শক্তির দিক থেকে পৃথিবীর সেরা ৯টি প্রাণীর চোয়ালের ক্ষমতা জেনে নেওয়া যাক।

হায়েনা: শক্তিশালী চোয়ালের অধিকারী মাংসাশী

মাংসাশী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে স্পটেড বা দাগি হায়েনার কামড়ের শক্তি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ নিউটন। দাগি হায়েনা মূলত আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলে দেখা যায়। দাগি হায়েনাকে অনেকে কেবল মৃতদেহখেকো ভাবলেও এরা আসলে দক্ষ শিকারি। নিজেদের শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে জেব্রাসহ বিভিন্ন প্রাণীর হাড় পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলা দাগি হায়েনা ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে। বর্তমানে বন্য পরিবেশে প্রায় ১০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক হায়েনা রয়েছে। মানুষের হামলা এবং বাসস্থান সংকটের কারণে দাগি হায়েনার সংখ্যা দিন দিন কমছে।

মেরু ভালুক: বৃহত্তম ভালুকের শক্তিশালী কামড়

ভালুক প্রজাতির মধ্যে মেরু ভালুকের কামড় সবচেয়ে শক্তিশালী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদের কামড়ের শক্তি ৫ হাজার নিউটন পর্যন্ত হয়ে থাকে। মেরু ভালুক পৃথিবীর বৃহত্তম ভালুক প্রজাতি। এরা মূলত সামুদ্রিক সিল শিকার করে বেঁচে থাকে। তবে শক্তিশালী চোয়ালের কারণে ওয়ালরাস ও বেলুগা তিমির মতো বড় প্রাণীও শিকার করতে পারে মেরু ভালুক। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বরফ গলে যাওয়ার কারণে মেরু ভালুক এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গরিলা: তৃণভোজী হলেও শক্তিশালী কামড়

গরিলা মূলত তৃণভোজী প্রাণী। এরপরও প্রাইমেট জাতীয় প্রাণীদের মধ্যে গরিলার কামড় সবচেয়ে শক্তিশালী। এক গবেষণায় গরিলার কামড়ের শক্তি প্রায় ৩ হাজার ৪২০ নিউটন পাওয়া গেছে। মানুষের সঙ্গে গরিলার ডিএনএর ৯৮ দশমিক ৩ শতাংশ মিল রয়েছে। তবে শক্তির দিক থেকে এরা মানুষের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি শক্তিশালী। তৃণভোজী হওয়া সত্ত্বেও এদের চোয়ালে লম্বা ও ধারালো ছেদক দাঁত থাকে। এই দাঁতগুলো গাছের শক্ত ছাল চিবিয়ে খেতে সাহায্য করে। রোগবালাই এবং বাসস্থান ধ্বংসের কারণে গরিলা বর্তমানে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে।

জাগুয়ার: বিড়ালদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কামড়

বিড়াল প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে জাগুয়ারের কামড়ের শক্তি দেহের আকারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এদের কামড়ের শক্তি ১ হাজার ২৫৪ নিউটন পর্যন্ত হয়ে থাকে। জাগুয়ারের চোয়াল ও দাঁত এতটাই শক্তিশালী, যা শিকারের মাথার খুলি ফুটো করে দিতে পারে। জাগুয়ারের কামড়ের চাপ সিংহ, বাঘ বা হায়েনার চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে জাগুয়ারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।

জলহস্তী: স্থলভাগের সবচেয়ে শক্তিশালী কামড়

স্থলভাগের প্রাণীদের মধ্যে জলহস্তীর কামড় সবচেয়ে শক্তিশালী। এদের প্রতি বর্গইঞ্চিতে কামড়ের শক্তি প্রায় ৮ হাজার ১৩০ নিউটন। শান্ত তৃণভোজী প্রাণী হলেও বিরক্ত করলে জলহস্তী অত্যন্ত হিংস্র হয়ে ওঠে। জলহস্তী সিংহ এবং কুমিরের মতো হিংস্র শিকারিকেও কামড়ে সহজে পরাস্ত করতে পারে। জলহস্তীর মুখের ভেতরের দাঁতগুলো ৫০ সেন্টিমিটার বা ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। এই দাঁতের কারণে শিকারিরা হাতির দাঁতের মতো এদেরও অবৈধভাবে শিকার করে থাকে। ২০০৬ সালে জলহস্তীকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

শর্টফিন মাকো হাঙর: রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী হাঙরের কামড়

উষ্ণ ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে এই বিপন্ন হাঙর দেখা যায়। ২০২০ সালে নিউজিল্যান্ডের কাছে বিজ্ঞানীদের তৈরি বিশেষ যন্ত্রে একটি মাকো হাঙরের কামড় রেকর্ড করা হয়। এর শক্তি ছিল ১৩ হাজার নিউটন। এটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী হাঙরের কামড়। আকারে গ্রেট হোয়াইট হাঙরের চেয়ে ছোট হলেও শর্টফিন মাকো হাঙরের কামড়ের শক্তি বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে।

গ্রেট হোয়াইট হাঙর: তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী

সমুদ্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকারি গ্রেট হোয়াইট হাঙরের কামড় তাত্ত্বিকভাবে সব হাঙরের চেয়ে বেশি। বিজ্ঞানীদের তৈরি চোয়ালের ডিজিটাল মডেলের তথ্যমতে, গ্রেট হোয়াইট হাঙরের কামড়ের শক্তি ১৮ হাজার নিউটন ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে বাস্তব জীবনে গ্রেট হোয়াইট হাঙরের কামড়ের শক্তি এখনো সরাসরি মাপা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পাখনা কাটা ও অবৈধ শিকারের কারণে সাগরের এই দানবটি বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে।

আমেরিকান অ্যালিগেটর: সরীসৃপের ভয়ংকর কামড়

সরীসৃপ শ্রেণির এই প্রাণীটির কামড় অন্যতম ভয়ংকর। আমেরিকান অ্যালিগেটর তার চোয়াল দিয়ে ১৩ হাজার ১৭২ নিউটন শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। ২০০৬ সালের এক গবেষণায় এটিই ছিল জীবিত কোনো প্রাণীর সর্বোচ্চ কামড়ের শক্তি। এদের কামড় বন্ধ করার শক্তি তীব্র হলেও মুখ খোলার পেশিগুলো বেশ দুর্বল। একজন মানুষ হাত দিয়ে বা শক্ত রাবার ব্যান্ড দিয়ে এদের মুখ বন্ধ রাখতে পারে। আমেরিকান অ্যালিগেটর মূলত মাছ, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী খেয়ে থাকে।

লোনাপানির কুমির: পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কামড়

লোনাপানির কুমিরকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কামড়ের অধিকারী প্রাণী বলা হয়। ২০১২ সালের এক গবেষণায় একটি কুমিরের কামড়ের শক্তি রেকর্ড করা হয় ১৬ হাজার ৪১৪ নিউটন। এটি পৃথিবীতে যেকোনো প্রাণীর সরাসরি রেকর্ড করা সর্বোচ্চ কামড়ের শক্তি। এরা ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করে। এরা দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খায় না। শিকারকে সরাসরি আস্ত গিলে ফেলে। এদের খাদ্যতালিকায় মাছ, হাঙর, পাখি এবং বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় এদের মানুষের ওপর আক্রমণ করার নজির রয়েছে।

সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার