বিশ্বকাপ মানেই বড় বড় তারকাদের মেলা। কিন্তু এবারের আসরে নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্সে আলো ছড়াচ্ছেন তিন গোলকিপার—কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া, কুরাসাওয়ের এলয় রম ও ইরানের আলীরেজা বেইরানভান্দ। তাঁদের বয়স তিরিশের বেশি, বড় তারকা নন, দেশের বাইরে খুব বেশি পরিচিত নন। তবে এই মুহূর্তে মেসি, এমবাপ্পেদের পাশে তাঁরাও জ্বলছেন নিজের আলোয়।
ভোজিনিয়া: ৪০ বছরে বিশ্বকাপে অভিষেক
কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে দ্বীপের এই গোলরক্ষকের পেশাদার ফুটবল শুরু ২৫ বছর বয়সে। আঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া—১৯ বছরের যাযাবর ক্যারিয়ার। বিশ্বকাপে আলোচনায় এসেছেন প্রথম ম্যাচেই স্পেনের বিপক্ষে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁর মায়ের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদন প্রথমে প্রত্যাখ্যাত হলেও পরে ভিসা পেয়ে তিনি এসেছেন, উরুগুয়ের বিপক্ষে ছেলের খেলা দেখেছেন। ভোজিনিয়া মাকে হতাশ করেননি, ড্র করেই মাঠ ছেড়েছে কেপ ভার্দে।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর ভোজিনিয়া মাঠ ছেড়েছিলেন চোখের জলে। দাদা-দাদির কাছে বড় হয়েছেন, কিন্তু নাতির বিশ্বকাপে খেলা দেখে যেতে পারেননি তাঁরা। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সী ভোজিনিয়া নিজ দেশের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলা সবচেয়ে বয়সী খেলোয়াড়। ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ৪০ হাজার থেকে বেড়ে এখন এক কোটির বেশি।
এলয় রম: এক ম্যাচে ১৬ সেভ
৩৭ বছর বয়সী কুরাসাও গোলরক্ষক এলয় রমকে হয়তো আপনি চিনতেন না, কিন্তু ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচের পর চিনেছেন নিশ্চিতভাবেই। ওই ম্যাচে তিনি করেছেন ১৬টি সেভ—বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৯০ মিনিটের ম্যাচে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ। রম বলছিলেন, মাঠে নামার পর এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস পেয়ে বসেছিল তাঁকে, মনে হচ্ছিল সেদিন তাঁকে ভেদ করে গোল করার সাধ্য কারও নেই। ভোজিনিয়ার মতোই ভাইরাল হয়েছেন রম, এক দিনের মধ্যেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী এক লাখ থেকে বেড়ে ১০ লাখের বেশি। অথচ তাঁর দেশ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখ!
আলীরেজা বেইরানভান্দ: কুর্দি যাযাবর থেকে বিশ্বকাপ নায়ক
ইরানের জনসংখ্যা অনেক বেশি, তবে বেইরানভান্দ অনন্য অনেক কারণে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সাতটি সেভ করে হয়েছেন ম্যাচসেরা। বিশেষ করে পয়েন্ট ব্ল্যাংক দূরত্ব থেকে ম্যাক্সিম ডি কুইপারের শট ফিরিয়ে দেওয়া এই বিশ্বকাপের সেরা সেভগুলোর একটি। জীবনটাও সংগ্রামী—কিশোর বয়সে জীবিকার অন্বেষণে তেহরানে এসেছিলেন, পকেট শূন্য, থাকার জায়গা নেই। কুর্দি যাযাবর পরিবারের ছেলে নাফত তেহরান ক্লাবের গেটের সামনে ঘুমাতেন, গাড়ি ধোয়ার কাজ করতেন, পিৎজার দোকানে কাজ করতেন। একদিন ক্লাব তাঁকে সুযোগ দেয়, বাকিটা ইতিহাস।
বেইরানভান্দ দুটি গিনেস রেকর্ডের অধিকারী—গোলকিপারদের দীর্ঘতম থ্রো (৬১ মিটার) এবং দীর্ঘতম ড্রপকিক (৭৮ মিটার)। ২০১৮ বিশ্বকাপে ঠেকিয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি। তৃতীয় বিশ্বকাপে এসেও দুর্ভেদ্য, দুই ম্যাচে খেয়েছেন মাত্র দুটি গোল। ইরানের সংবাদমাধ্যম লিখেছে, 'যিনি বন্ধ করে দিয়েছেন হুরমুজ প্রণালি'।
ভোজিনিয়া, রম ও বেইরানভান্দের দল 'ছোট', বিশ্বকাপে বেশি দূর যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁরা হয়ে উঠেছেন এই বিশ্বকাপের তারা।



