জামালপুরে তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের সংকট আরও প্রকট। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। গরমে অসহনীয় কষ্টের পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচও নির্বিঘ্নে দেখতে পারছেন না।
গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ বেশি
শহরের গ্রাহকদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকার বাসিন্দারা। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। বর্তমানে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের অর্ধেকেরও কম পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায় বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এ সংকট অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, পিডিবির আওতায় থাকা এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। এটা অনেকটাই স্বাভাবিক বলা যায়।
লোডশেডিং বেড়েছে কয়েক গুণ
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে সাধারণত ঝড়বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ার সময় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন থাকত। তবে এক সপ্তাহ ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা।
গ্রাহকেরা বলছেন, প্রচণ্ড গরমে ঘন ঘন লোডশেডিং জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলমান বিশ্বকাপের ম্যাচ না দেখতে পারার হতাশা। বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন অনিশ্চয়তার কারণে কোনো ম্যাচই পুরোপুরি দেখা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক এলাকায় আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর টানা এক থেকে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ আসার আগেই ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা পুরো খেলাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই জেনারেটর ভাড়া করে বা বিকল্প উপায়ে খেলা দেখার চেষ্টা করছেন। এতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে তাঁদের।
চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৭০-৭৫
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর থেকে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজীবপুর এলাকাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ওই দুটি উপজেলাসহ জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট। কিন্তু চলতি মাসের শুরু থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট।
বকশীগঞ্জ উপজেলার বিলেরপাড় এলাকার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গরমের কষ্ট কোনোভাবে সহ্য করে নেওয়া যায়। কিন্তু চার বছর পর আসা বিশ্বকাপের আনন্দ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। গত এক সপ্তাহে লোডশেডিং এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে একটি ম্যাচও পুরোপুরি দেখতে পারিনি। খেলার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। আবার আসার পর দেখা যায় ম্যাচ শেষ। অনেক সময় খেলা শুরুর আগেই বিদ্যুৎ থাকে না। এককথায় আমরা চরম ভোগান্তিতে আছি।’
মাদারগঞ্জের বালিজুড়ী এলাকার মোহাম্মদ বাবু মিয়া বলেন, বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে তাঁদের মতো সাধারণ মানুষের কত আবেগ ও প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু তীব্র লোডশেডিং সেই আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। খেলা শুরুর কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে যায়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ও গোল দেখার সুযোগ হারাতে হচ্ছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের এই অনিশ্চয়তা আমাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।’
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সত্যিই নিরুপায় হয়েই লোডশেডিং করছি। আমরা যা বিদ্যুৎ পাই, সেটাই সরবরাহ করি। বিশ্বকাপের বিষয়টি আমরাও বুঝি। আমাদের তো কিছুই করার নেই। রাতে এখন আরও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।’



