লাউতারো মার্তিনেজের গোলে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল নিশ্চিত
লাউতারো মার্তিনেজের গোলে আর্জেন্টিনার সেমি নিশ্চিত

ম্যাচ তখন শেষের পথে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে লড়ছে দুই দল। ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজের ১১২ মিনিটের দুর্দান্ত গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষ হয়নি। সুইজারল্যান্ড ফিরে আসার শেষ চেষ্টা করছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সেমিফাইনালের টিকিট পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে এলেন লাউতারো মার্তিনেজ। তার গোলেই সব অনিশ্চয়তার শেষ। স্কোরলাইন ৩-১। আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে। আলভারেজ দরজা খুলেছিলেন, লাউতারো সেই দরজা দিয়ে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দিলেন।

লাউতারো মার্তিনেজের পটভূমি

১৯৯৭ সালের ২২ আগস্ট আর্জেন্টিনার বাহিয়া ব্লাঙ্কায় জন্ম তার। বাবা মারিও মার্তিনেজ নিজেও ফুটবল খেলতেন। বাবার হাত ধরেই ছোট্ট লাউতারোর ফুটবলের সঙ্গে পরিচয়। মা কারিনা ভ্যানেসা গুতিয়েরেসও ছেলের স্বপ্নের পাশে ছিলেন নীরব শক্তি হয়ে। সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা লাউতারোর পথটা তাই শুধু প্রতিভায় তৈরি হয়নি, পেছনে ছিল বাবা-মায়ের ত্যাগ, অপেক্ষা আর সন্তানের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।

রেসিং ক্লাবের একাডেমিতে শুরু হয় তার বড় ফুটবলার হয়ে ওঠার যাত্রা। শক্তি, ক্ষিপ্রতা, গোলের ক্ষুধা আর প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই তাকে এনে দেয় একটি ডাকনাম ‘এল তোরো’, অর্থাৎ ষাঁড়। নামটি তার ফুটবলেরই প্রতিচ্ছবি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইন্টার মিলানে সাফল্য ও অধিনায়কত্ব

২০১৮ সালে ইউরোপের পথে পা বাড়ান লাউতারো। যোগ দেন ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানে। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল। বাহিয়া ব্লাঙ্কা থেকে উঠে আসা ছেলেটি কঠিন পথেই তো হাঁটতে শিখেছিলেন। ধীরে ধীরে ইন্টারের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠেন। একসময় তার বাহুতেই ওঠে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইন্টার মিলানের হয়ে ইতালিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপা জিতেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করেছেন এবং ক্লাবের আক্রমণের মুখ হয়ে উঠেছেন। সামনে থেকে প্রেসিং, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি, বল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখার অসাধারণ সামর্থ্য রয়েছে এই আর্জেন্টাইনের।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে চড়াই-উতরাই

আর্জেন্টিনার জার্সিতে পথটাও সব সময় সহজ ছিল না। গোল করেছেন, শিরোপা জিতেছেন, কঠিন সময়ও পার করেছেন। কাতার বিশ্বকাপে চোট ও ফর্মের সমস্যার কারণে প্রত্যাশিত ছন্দে থাকতে পারেননি। প্রথম একাদশে জায়গা হারিয়েছিলেন হুলিয়ান আলভারেজের কাছে। দল ছেড়ে যাননি, ভেঙে পড়েননি। বেঞ্চে থেকেও অপেক্ষা করেছেন নিজের মুহূর্তের জন্য।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২০২২ বিশ্বকাপের সেই শ্বাসরুদ্ধকর কোয়ার্টার-ফাইনাল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার শেষ পেনাল্টিটি নিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন লাউতারো। পুরো একটি দেশের হৃদস্পন্দন তখন তার পায়ের কাছে। গোল করলেন। আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল সেমিফাইনালে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরলেন। আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। লিওনেল মেসির হাতে ওঠে বিশ্বকাপ। সেই দলের একজন গর্বিত সদস্য লাউতারো।

২০২৪ কোপা আমেরিকা ও বর্তমান বিশ্বকাপ

২০২৪ কোপা আমেরিকায় আবার দেখা যায় অন্য এক লাউতারোকে। গোল করেন, ম্যাচের পর ম্যাচ আর্জেন্টিনার আক্রমণে পার্থক্য গড়ে দেন। ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে তার গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। আবারও অতিরিক্ত সময়। আবারও চাপ। আবারও লাউতারো।

মাঠের বাইরেও পরিবার লাউতারোর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। স্ত্রী আগুস্তিনা গান্দোলফো এবং সন্তানদের নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন তাকে ফুটবলের প্রচণ্ড চাপের বাইরে আশ্রয় দেয়। মাঠে ‘এল তোরো’ ষাঁড়ের মতো লড়াকু এক স্ট্রাইকার। পরিবারের কাছে স্বামী, বাবা এবং সেই বাহিয়া ব্লাঙ্কার ছেলেটি, যে নিজের শিকড় ভুলে যায়নি।

চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এসেছে ইতিহাসের আরও একটি কঠিন অভিযানে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখার চাপ, কোটি মানুষের প্রত্যাশা এবং প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের সর্বোচ্চ প্রতিরোধে এগোতে হচ্ছে তাদের।

গোলের সৌন্দর্য শুধু বল জালে জড়ানোর মধ্যে ছিল না। একজন গোলদাতার জীবনে কখনো ৯০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়, কখনো ১২০ মিনিট। সুযোগ এলে এক মুহূর্তই যথেষ্ট। ফুটবলে আলো অনেক সময় একজনের ওপর পড়ে। বিশ্বকাপ জিততে প্রয়োজন অনেক নায়ক। কেউ শুরু করেন, কেউ পথ দেখান, কেউ সংকটের মুহূর্তে দলকে বাঁচান, কেউ এসে শেষ কথাটি লিখে দেন। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হুলিয়ান আলভারেজ লিখেছিলেন জয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায়। লাউতারো মার্তিনেজ টেনেছিলেন শেষ দাগটি।