ফুটবলের প্রেমে যেভাবে মজে আছি: বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ
ফুটবলের প্রেমে যেভাবে মজে আছি: বিশ্বকাপ স্মৃতিচারণ

১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের জুলাই মাসের এক ভোরে টাইব্রেকারের শেষ শট জালে জড়াতেই হৃদপুর বন্দরের রাস্তায় নেমেছিল ব্রাজিল ফুটবল উৎসব। মিছিলটি তৈবরদার বাড়ির সামনে থেকে শুরু হয়, সামনে তবারক কাকু—পরনে ক্যানারি হলুদ জার্সি, হাঁটু পর্যন্ত হাফপ্যান্ট, পায়ে ফুটবল বুট, দুই হাতে বুকের কাছে আগলে রাখা একটি ফুটবল। দেখে মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপটা রোমারিও নয়, তিনিই জিতে ফিরেছেন। এস এস উচ্চবিদ্যালয়ের ব্যান্ড দল ড্রাম বাজিয়ে পথ দেখাচ্ছিল। ‘ব্রাজিল...ব্রাজিল...’ স্লোগানে ভোরের আলোও যেন একটু হলুদ হয়ে উঠেছিল। তখন সাম্বা কী, জানতাম না। শুধু দেখেছিলাম, ফুটবল মানুষকে কত সহজে এক আনন্দে মিলিয়ে দিতে পারে।

বিশ্বকাপের স্নায়ুযুদ্ধ

জুন–জুলাই এলেই সেই সকালটা ফিরে আসে। বিশ্বকাপ যেন শুধু মাঠে নয়, মানুষের ভেতরেও শুরু হয়। চলতি বিশ্বকাপের জাপান–ব্রাজিল ম্যাচটি দেখতে গিয়েও সেই অনুভূতিটাই ফিরে এল। এক গোলে পিছিয়ে পড়েও ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরা, যোগ করা সময়ে জয়—এমন ম্যাচ মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বকাপে স্নায়ুরও আলাদা একটি স্কোরবোর্ড থাকে। ম্যাচ শেষে রোমারিও লিখেছেন, বড় টুর্নামেন্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি দল ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফিরছে কি না। কথাটা শুধু ব্রাজিলের নয়; বিশ্বকাপেরও।

নেইমারের দুঃখবিলাস

অনেক পরে নেইমার এলেন। তাঁর পায়ে ছিল কল্পনা, কাঁধে ছিল একটি দেশের দীর্ঘ অপেক্ষা। বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি। কিন্তু একটি প্রজন্মকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছেন। তাই নেইমারকে মনে হয়, আমাদের সময়ের সবচেয়ে সুন্দর দুঃখবিলাস। কারণ, স্কোরবোর্ড সব সময় ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি বলে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুটবলের বিস্তৃত ভাষা

আমরা যে ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলাম, তার ভাষা ছিল অনেক বিস্তৃত। ব্রাজিলের ফুটবলার সক্রেটিস শিখিয়েছিলেন, ফুটবল শুধু পায়ে নয়, ভাবনাতেও খেলা হয়। রোনালদো নাজারিও গতিকে নতুন অর্থ দিয়েছিলেন। রবার্তো কার্লোসের বাঁ পা যেন পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে মাঝেমধ্যে তর্কে জড়িয়ে পড়ত। কাফু ক্লান্তিহীন দৌড়ে বুঝিয়েছেন, সৌন্দর্য শুধু ড্রিবলে নয়, পরিশ্রমেও থাকে। পরে রোনালদিনহো ফুটবলকে আবার শিশুর হাসি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

আবার ব্রাজিলের বাইরেও ছিল অন্য সব ভাষা। জিনেদিন জিদানের প্রথম ছোঁয়া, ডেভিড বেকহেমের বাঁক নেওয়া ক্রস, লুইস ফিগোর মাপা ছন্দ, পাওলো মালদিনির নীরব রক্ষণ, রবার্তো বাজ্জিওর বিষণ্ন চোখ কিংবা লিওনেল মেসির অসম্ভবকে স্বাভাবিক করে তোলা—সব মিলিয়েই আমরা ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলাম।

বিশ্বকাপ শুধু একটি দেশের গল্প নয়

এই কারণেই বিশ্বকাপ কখনো শুধু একটি দেশের গল্প নয়। নেদারল্যান্ডস আমাদের কল্পনাকে বড় করেছে। জার্মানি দেখিয়েছে, শৃঙ্খলাও মুগ্ধ করতে পারে। ইতালি শিখিয়েছে, রক্ষণভাগও একধরনের ভাষা। এবারের বিশ্বকাপে ইতালি নেই। তবু তাদের অনুপস্থিতিও যেন বিশ্বকাপের গল্পেরই একটি অংশ।

আজকের প্রজন্মের ফুটবল দেখা

আজকের প্রজন্মের হাতে স্মার্টফোন। সামনে অসংখ্য হাইলাইটস। কয়েক সেকেন্ডেই দেখা যায় একটি ম্যাচের সারাংশ। অথচ গোল হওয়ার আগের নীরবতা, শেষ বাঁশির আগের উৎকণ্ঠা কিংবা হেরে গিয়েও মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়ে যাওয়া একজন ফুটবলারের মুখ—এসবের কোনো শর্টকাট নেই। ৯০ মিনিটের আবেগ এখনো ৯০ মিনিটেই ধরা দেয়।

ফিরে দেখা সেই ভোর

আজও হৃদপুর বন্দরের সেই ভোরে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। তবারক কাকুর বুকের কাছে আগলে রাখা ফুটবলটা মনে পড়ে। এখন বুঝি, তিনি শুধু একটি বল ধরে ছিলেন না। তিনি আগলে রেখেছিলেন এক সময়কে। সেই সময়ে ব্রাজিল ছিল, আর্জেন্টিনা ছিল, ইতালি ছিল, জার্মানি ছিল, নেদারল্যান্ডস ছিল। তারও আগে ছিল ফুটবল।

বিশ্বকাপ আবার আসবে। নতুন নায়ক জন্ম নেবে। নতুন জার্সি, নতুন গল্পও তৈরি হবে। তবু কোথাও কোনো হৃদপুর বন্দরে আবার একটি মিছিল বের হবে। কোনো ব্যান্ড দলের ড্রাম বাজবে। কোনো শিশুর চোখে প্রথমবারের মতো গোল হয়ে উঠবে বিস্ময়। সেই দিনও হয়তো কেউ বুঝবে—আমরা আসলে কোনো একটি দেশের প্রেমে পড়িনি। আমরা যে ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলাম, তার প্রেমে আজও মজে আছি।