ভূমিকম্পে নিহত ২২৯৫, রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা
ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৯৫ জনে। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, এত প্রাণহানিতে দেশের ‘আত্মা ক্ষতবিক্ষত’ হয়ে গেছে।
উদ্ধার অভিযান প্রায় শেষ, ধ্বংসস্তূপে ‘ডি’ চিহ্ন
রাজধানী কারাকাসের উত্তরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহর লা গুয়াইরার অধিকাংশ ধসে পড়া ভবনে ‘ডি (ডিসিস্ট)’ চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে। এর অর্থ, সেখানে তল্লাশি চালিয়ে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। স্পেনের একটি উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোদেস বলেন, ‘যেখানে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে সময় নষ্ট করা হয় না।’ তার দলের প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর নালাও ধ্বংসস্তূপে জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে পায়নি।
অলৌকিক উদ্ধার: ছয় দিন পর জীবিত শিশু
তবে এর মধ্যেও অলৌকিক কিছু ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সি এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কমে যায়। ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, প্রায় ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
খাদ্য ও পানির তীব্র সংকট
ভূমিকম্পের পর তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে আগে থেকেই দেশটির অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল ছিল। এখন সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। লা গুয়াইরার ১৮ বছর বয়সি বিক্রেতা দানিয়েলা আরমাস বলেন, ‘ত্রাণ দেওয়া হয়, কিন্তু খাবারের জন্য মানুষ প্রায় মারামারি করে। পরিস্থিতি যেন মোরগ লড়াইয়ের মতো।’ চুরি ও লুটপাটের ঘটনাও বেড়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান জিনিস চুরির অভিযোগে বুধবার চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থার জরুরি তহবিল আবেদন
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ভেনেজুয়েলা প্রধান লিয়া পোজ্জিও বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন।’ ত্রাণের জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন দিন দিন আরও বাড়ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া তরুণী আইসমার লোপেজ বলেন, ‘আমি যখন খাই, তখন মনে হয় কোথাও না কোথাও কেউ না খেয়ে আছে। তাই অপরাধবোধ হয়।’ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগামী তিন মাসে পাঁচ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি ডলার জরুরি তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য সংকট ও রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা
ভূমিকম্পের পর সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেন, হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে, কারণ ভূমিকম্পের আগেই টিকাদানের হার ছিল কম। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা আগামী ছয় মাসে ৩০ হাজার মানুষের জন্য জরুরি আশ্রয় ও সহায়তা নিশ্চিত করতে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার তহবিলের আবেদন করেছে।
ভবন ধ্বংস ও স্বজনদের সন্ধান
নাসার প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও স্বজনদের খুঁজছেন অনেক মানুষ। লা গুয়াইরার বাসিন্দা হেলেন গুয়েদেজ ও তার ভাই ধসে পড়া একটি ভবনে বাবা, বোন ও দাদিকে খুঁজে চলেছেন। হেলেন বলেন, ‘আমরা খোঁজ চালিয়ে যাব। যদি জীবিত না-ও পাই, অন্তত তাদের মরদেহ উদ্ধার করে সম্মানের সঙ্গে দাফন করতে চাই।’ তথ্যসূত্র: ফ্রান্স২৪।



