আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ যেন এক চিরন্তন রেশারেশির গল্প। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত 'হ্যান্ড অব গড' গোল থেকে শুরু করে ১২ বছর পর সেন্ট-এতিয়েনে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড—এই দুই দেশের লড়াইয়ে নাটক বা রোমাঞ্চের অভাব হয়নি কখনোই। রাজনৈতিক কারণে মাঠে একে অপরকে মোকাবিলা করতে না চাওয়ায় এই দুই দল বিশ্বকাপের বাইরে প্রায় খেলেই না।
আসন্ন সেমিফাইনালে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী
আরেকটি ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ সামনে। বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী ১৬ জুলাই রাতে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মাঠে নামছে দুই দল। গত প্রায় ২১ বছরের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে তাদের প্রথম দেখা। ২০০৫ সালের পর এই প্রথমবারের মতো তারা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে।
মেসির অভিষেকের পর মাত্র একবার দেখা
১৮ বছর বয়সে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দলে অভিষেকের পর, দুই দল মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল এবং সেই ম্যাচটি হয়েছিল তার অভিষেকের তিন মাসও পূর্ণ হওয়ার আগে। দুই দলের ছয়বারের দেখায় সেটিই একমাত্র প্রীতি ম্যাচ ছিল। বাকি পাঁচটি ছিল বিশ্বকাপে।
২০০৫ সালের আগস্টে ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপে আর্জেন্টিনাকে জেতানোর পর জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন মেসি। তবে জেনেভায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই প্রীতি ম্যাচে তিনি খেলতে পারেননি, কারণ আন্তর্জাতিক অভিষেকের মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখায় তিনি তখন নিষিদ্ধ ছিলেন। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। ভিলমোস ভানজাকের একটি ফাউলের প্রতিক্রিয়ায় সেই ডিফেন্ডারের দিকে হাত কনুই দিয়ে আঘাত করায় রেফারি মার্কাস মার্ক তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
মেসিকে ছাড়াই সেই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে দক্ষিণ আমেরিকানরা দুইবার এগিয়ে গেলেও, মাইকেল ওয়েনের শেষ মুহূর্তের দুটি নাটকীয় গোলে সোভেন-গোরান এরিকসনের ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়।
বিশ্বকাপে শুরু ১৯৬২ সালে
বিশ্বকাপে এই দুই দলের দ্বৈরথ শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে। প্রতিটি ম্যাচেই দেখা গেছে চোখধাঁধানো গোল, তুমুল বিতর্ক আর লাল কার্ডের ছড়াছড়ি। তবে এই শত্রুতা শুধু মাঠের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮০-এর দশকের ফকল্যান্ড যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকরা এখনও তাদের ফুটবলীয় গানে এই যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
অনেকে মনে করেন যে রাজনৈতিক ও সামরিক পরাজয়ের প্রতিশোধ ফুটবল মাঠে খোঁজে আর্জেন্টিনা। দুই দেশের কাছেই এটি শুধুই খেলা নয়, বরং জাতীয় সম্মান রক্ষার লড়াই।
হ্যান্ড অব গড থেকে বেকহ্যামের লাল কার্ড
১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করে ইংল্যান্ডকে হারান, যা 'হ্যান্ড অব গড' নামে পরিচিত। একই ম্যাচে তিনি শতাব্দীর সেরা একক গোলও করেন। এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে আরেকবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ডিয়েগো সিমিওনির সঙ্গে ধস্তাধস্তির কারণে লাল কার্ড দেখেন ডেভিড বেকহাম, সে সময় যা ইংলিশ গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
১৯৬৬ সালের বিতর্কিত ম্যাচ
এর আগেও দুই দলের মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক মাঠে দেখা গেছে। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দেওয়া হয়, যা নিয়ে ছিল চরম বিতর্ক। রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ আলফ রামসে তার খেলোয়াড়দের নির্দেশ দেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে জার্সি বদল না করতে এবং আর্জেন্টাইনদের প্রকাশ্যে 'পশু' বলে গালি দেন। এই মন্তব্যকে আর্জেন্টাইনরা বর্ণবাদী ও চরম অপমানজনক হিসেবে দেখে, যা দুই দেশের ফুটবলীয় সম্পর্ককে আজীবনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রীতি ফুটবল ম্যাচে দুই দলকে সেভাবে দেখা যায়নি।



